নগরীর হেতেমখাঁয় অবস্থিত মুসলিম উচ্চ বিদ্যালয় স্কুলের সামনে বিক্ষোভ মিছিল, মানববন্ধন শেষে প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে স্লোগান দিয়ে তাকে অবরুদ্ধ করে রাখে শিক্ষার্থীরা। অন্যদিকে ওই স্কুলের শিক্ষকরা প্রধান শিক্ষকের বিভিন্ন অনিয়ম বিষয় নিয়ে সাংবাদিক সম্মেলন করেন।
সাংবাদিক সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে জানানো হয়,
আমরা আজ প্রধান শিক্ষক মো. একরামুল হক-এর বিরুদ্ধে উত্থাপিত আর্থিক দুর্নীতি, নারীর প্রতি অশালীন আচরণ এবং প্রশাসনিক অনিয়মসহ অন্যান্য গুরুতর অভিযোগগুলো আপনাদের সামনে তুলে ধরতে চাই, যার নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করছি।
১. আর্থিক লেনদেন সংক্রান্ত মারাত্মক অনিয়ম-দুর্নীতি:
অবৈধ 'ক্যাশ ইন হ্যান্ড' ও অর্থ আত্মসাৎ: প্রধান শিক্ষক মো. একরামুল হক ২০২৪-২৫ অর্থবছরে শিক্ষার্থীদের ফি, পুকুর লিজের পাওনা ও অন্যান্য খাত থেকে আদায়কৃত মোট ১০,২৭,৭২৫/- (দশ লক্ষ সাতাশ হাজার সাতশত পঁচিশ টাকা মাত্র)-এর মধ্যে ২,০০,৬২৫/- (দুই লক্ষ ছয়শত পঁচিশ টাকা মাত্র) টাকা নিয়মবহির্ভূতভাবে নিজের হাতে (ক্যাশ ইন হ্যান্ডে) রেখে দেন। স্কুলের অভ্যন্তরীণ অডিট কমিটিও (১৬ জুলাই ২০২৫) প্রাথমিক তদন্তে এই অনিয়ম খুঁজে পেয়েছে। স্টোর প্রদও বাবদ প্রদত্ত শিক্ষক নিয়োগে চাঁদাবাজি: নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত সহকারী শিক্ষকদের (যেমন: মোছা. শ্রাবনী সুলতানা) কাছ থেকে তিনি আপ্যায়নের
৪০,০০০/- হাজার টাকা আত্মসাত।
নামে ১২,০০০/- (বারো হাজার টাকা মাত্র) চাঁদা নেন এবং তা আত্মসাৎ করেন। পূর্বের নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকদের কাছেও তিনি মোটা অংকের টাকা দাবি করেছিলেন।
'স্কুল অ্যাসেট'-এর আয় ব্যক্তিগত পকেটে: বিদ্যালয়কে ভেন্যু হিসেবে ভাড়া দিয়ে পাওয়া অর্থ, যা প্রতিষ্ঠানের তহবিলে জমার কথা, তা তিনি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা না দিয়ে ব্যক্তিগতভাবে ব্যবহার করেছেন।(২০২০ থেকে ২০২৫)কোচিংয়ের নামে প্রতারণা ও অর্থ আত্মসাৎ: ২০২২ সালে এসএসসি পরীক্ষার্থীদের কাছ থেকে 'বিশেষ কোচিং'-এর নামে কারো কাছ থেকে ১,২০০/- বা তার আশেপাশে 'অতিরিক্ত অর্থ' আদায় করে প্রায় ৪০ (চল্লিশ) হাজার টাকা আত্মসাৎ করেন, কিন্তু কোনো কোচিং পরিচালনা করেননি।
ক্রয় কমিটিকে এড়িয়ে বিল জালিয়াতি: তিনি ক্রয় কমিটিকে এড়িয়ে নিজের ইচ্ছামত পণ্য-উপকরণ কিনে বিল ভাউচার প্রস্তুত করেন এবং কমিটির সদস্যদের জোরপূর্বক অবৈধ বিল ভাউচারে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করেন। উদাহরণস্বরূপ, তিনি নিজের কক্ষের দুটি কাঠের চেয়ার ৩২,০০০/- (বত্রিশ হাজার টাকা মাত্র) মূল্যে ক্রয় করে বিল তৈরি করেন।
২. নারী সহকর্মীর সাথে অশালীন ও নোংরা আচরণ:
কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি: এক নারী, সহকারী শিক্ষক (সোহানা শারমিন) প্রধান শিক্ষককে 'দুর্নীতিবাজ' আখ্যায়িত করে তার চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তুললে, প্রধান শিক্ষক তাকে পাল্টা প্রশ্ন করেন, "আমার চরিত্র যে আপনি জানেন, কয়টি রাত আপনি আমার সাথে কাটিয়েছেন?"। এই চরম অশালীন ও নোংরা মন্তব্যের প্রতিবাদে অভিযোগ (৩০-১০-২০২৪) দাখিল হলেও এখন পর্যন্ত কোনো তদন্ত বা দৃশ্যমান কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এই আচরণ হাইকোর্ট বিভাগের ২০০৯ সালের নির্দেশনা (যৌন হয়রানি প্রতিরোধে) অমান্য করার শামিল।
৩. প্রশাসনিক ও বিধিবহির্ভূত গুরুতর অনিয়ম:
বিধি বহির্ভূতভাবে রাজনীতি ও নির্বাচন: এনটিআরসিএ ইনডেক্সধারী প্রধান শিক্ষক পদে বহাল থেকে তিনি নওগাঁ জেলার নিয়ামতপুর থানার ০৫ নং রসুলপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী হিসেবে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের মনোনয়ন প্রত্যাশী হিসেবে প্রচার-প্রচারণা ও দলীয় মনোনয়নপত্র জমা দেন। এটি ইন্টারমিডিয়েট অ্যান্ড সেকেন্ডারি এডুকেশন অর্ডিন্যান্স, ১৯৬১ (ধারা ৩০(১) (ক) ও (খ)) এবং চাকরির আচরণবিধির স্পষ্ট লঙ্ঘন।
অনুমতি ছাড়া দুই পদে প্রধান শিক্ষক: তিনি নিজ প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটির লিখিত অনুমতি ছাড়া নওগাঁর নিয়ামতপুরে 'আশার আলো পাবলিক স্কুল' নামে একটি প্রতিষ্ঠানের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। যা বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের চাকুরির শর্তাবলী ও প্রবিধান, ১৯৭৯-এর ধারা ৯ অনুযায়ী সম্পূর্ণ অবৈধ ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
সভাপতির নির্দেশ অমান্য করে 'ভোজন বাণিজ্য': সম্মানিত প্রধান শিক্ষক পদে থেকেও তিনি বিদ্যালয়ে আয়োজিত প্রশিক্ষণ কর্মশালাগুলোর 'ক্যাটারিং সার্ভিস' বা দুপুরের খাবারের দায়িত্ব নিজে নিয়ে 'বাবুর্চি'র কাজ করেন। এতে স্কুলের সুষ্ঠু শিক্ষার পরিবেশ ব্যাহত হয়। সভাপতির নিষেধ সত্ত্বেও তিনি ২৯-৩১ মে ২০২৫ইং তারিখে নিজ বাড়িতে রান্না করে প্রায় ৩৫০ জনের খাবার সরবরাহ করেন।
ম্যানেজিং কমিটি গঠনে জালিয়াতি: সম্প্রতি প্রকাশিত চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় বিদ্যালয়ের নিয়মিত শিক্ষার্থীর সংখ্যার (১৬৪ জন) তুলনায় অভিভাবক ভোটারের সংখ্যা প্রায় ৬৪ জন বেশি দেখানো হয়েছে। এতে প্রতীয়মান হয় যে, তিনি অন্য বেসরকারি স্কুলের শিক্ষার্থীদের বোর্ড রেজিস্ট্রেশন করানোর পাশাপাশি তাদের অভিভাবকদেরও ভোটার তালিকাভুক্ত করেছেন এবং নিজের ইচ্ছামতো কমিটি গঠনের অপচেষ্টা চালাচ্ছেন।
আমাদের ৫ দফা জরুরি দাবি
বারবার অভিযোগ (যেমন: ২৫/০৯/২০২৪ তারিখে ২৭ জন অভিভাবকের অভিযোগ এবং ১৭/০৭/২০২৫ তারিখে ১৭ জন শিক্ষক- কর্মচারীর অভিযোগ) দাখিল হওয়া সত্ত্বেও দৃশ্যমান কার্যকর পদক্ষেপ গৃহীত হয়নি। এমনকি জেলা প্রশাসনের তদন্ত প্রতিবেদনেও অভিযোগসমূহ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণের জন্য যথেষ্ট তথ্য-প্রমাণ না পাওয়ায় অধিকতর তদন্তের সুপারিশ করা হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে, আমরা রাজশাহী মুসলিম উচ্চ বিদ্যালয়ের গৌরব পুনরুদ্ধারের স্বার্থে নিম্নোক্ত ৫ দফা দাবি জানাচ্ছি:
১. অবিলম্বে (অনধিক তিন কর্মদিবসের মধ্যে) অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষক মো. একরামুল হককে তার পদ থেকে অস্থায়ীভাবে বহিষ্কার (সাসপেন্ড) করতে হবে।
২. অবিলম্বে (অনধিক ১৫ দিনের মধ্যে) মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (সিএজি), বিভাগীয় প্রশাসন, জেলা প্রশাসন, মাউশি, দুদকসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ উচ্চতর তদন্ত কমিটি গঠন করতে হবে।
৩. উক্ত উচ্চতর তদন্ত কমিটিকে (কমিটি গঠনের অনধিক ৩০ কর্ম দিবসের মধ্যে) সকল অভিযোগ সরেজমিনে তদন্ত করে চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করতে হবে।
৪. তার হেফাজতে থাকা/আত্মসাৎকৃত সমূদয় অর্থ অবিলম্বে (নির্দেশ প্রদানের অনধিক ১৫ দিনের মধ্যে) প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা দিতে হবে।
৫. তদন্তে সন্দেহাতীতভাবে অপরাধ প্রমাণিত হওয়া সাপেক্ষে তাকে তার পদ থেকে আজীবনের জন্য চূড়ান্তভাবে বহিষ্কার এবং দেশের প্রচলিত আইনানুযায়ী কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
আমরা বিশ্বাস করি, আপনাদের লেখনীর মাধ্যমে এই ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের করুণ অবস্থার চিত্র সমাজের সামনে উঠে আসবে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করে এর গৌরব রক্ষা করবে
২৭/২, দূর্গাপুর, উপর রাজারামপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৬৩০০
২০২৫ © দৈনিক অধিকার কতৃক সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত