খুলনার কাজিবাছা নদী থেকে উদ্ধার হওয়া মাথাবিহীন এক নারীর লাশের রহস্য অবশেষে উদ্ঘাটন করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। মেহেদি দেওয়া হাত ও আঙুলের আংটি দেখে শুরু হওয়া সন্দেহের সূত্র ধরে ডিএনএ পরীক্ষায় নিশ্চিত হওয়া যায়—অজ্ঞাতপরিচয় সেই লাশটি ডুমুরিয়া উপজেলার সাজিয়াড়া গ্রামের সালেহা বেগমের।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গত বছরের ১৯ আগস্ট রাতে কাজিবাছা নদী থেকে মাথা ও পোশাকবিহীন এক নারীর মরদেহ উদ্ধার করে বটিয়াঘাটা থানা পুলিশ। দীর্ঘ সময় পানিতে থাকায় মরদেহের চেহারা বিকৃত হয়ে যায়। হাত পচে যাওয়ায় আঙুলের ছাপ দিয়ে পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। পরদিন অজ্ঞাতনামা আসামির বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করা হয়। পরে আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলামের মাধ্যমে নগরীর গোয়ালখালী কবরস্থানে মরদেহটি দাফন করা হয়।
এর প্রায় দেড় মাস পর, গত ৮ অক্টোবর সালেহা বেগমকে অপহরণের অভিযোগ এনে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে মামলা করেন তাঁর ছেলে শামীম ফকির। আদালত মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব দেয় পিবিআইকে। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা উপপরিদর্শক রেজোয়ান তদন্ত শুরু করেন।
তদন্তে উঠে আসে, সালেহা বেগম ২০১৮ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত সৌদি আরবে গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করেন। দেশে ফিরে ২০২৪ সালে ঢাকায় একটি বাসায় কাজ নেন। গত ১৯ আগস্ট থেকে তাঁর মোবাইল নম্বর বন্ধ পাওয়া যায়। পরিবারের সন্দেহ ছিল প্রতিবেশী লালন গাজীর ওপর, যার সঙ্গে সালেহার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল।
পিবিআই মোবাইল কললিস্ট বিশ্লেষণ করে জানতে পারে, সালেহার নম্বরটি দীর্ঘদিন পিরোজপুরের ইন্দুরকানী এলাকায় সক্রিয় ছিল এবং সর্বশেষ অবস্থান ছিল বটিয়াঘাটার গজালিয়া গ্রামে। স্থানীয় অনুসন্ধানে জানা যায়, তিনি এক বছর ধরে স্বামী পরিচয় দেওয়া এক ব্যক্তির সঙ্গে ভাড়া বাসায় ছিলেন। প্রতিবেশীরা জানান, ১৯ আগস্ট দুজন একসঙ্গে বের হন এবং ২৫ আগস্ট ওই ব্যক্তি একাই ফিরে এসে ঘরের মালপত্র নিয়ে চলে যান।
থানায় সংরক্ষিত লাশের ছবি পর্যালোচনা করে একটি ছবিতে দেখা যায়, নারীর হাতে মেহেদি দেওয়া এবং আঙুলে আংটি ছিল। সেই ছবি স্বজনদের দেখালে তারা সালেহা বেগম বলে সন্দেহ প্রকাশ করেন। পরে আদালতের নির্দেশে ডিএনএ পরীক্ষা করা হলে নিহতের ছেলেদের ডিএনএর সঙ্গে সংরক্ষিত নমুনার মিল পাওয়া যায়। এতে নিশ্চিত হয়, অজ্ঞাত লাশটি সালেহা বেগমেরই।
তদন্তে আরও জানা যায়, সালেহা বেগমের জমানো ১৫ থেকে ১৬ লাখ টাকা আত্মসাৎ করতেই লালন গাজী তাঁকে প্রেমের সম্পর্কের মাধ্যমে ফাঁদে ফেলেন। একপর্যায়ে সালেহা বিয়ের জন্য চাপ দিলে লালন পরিকল্পিতভাবে তাঁকে বটিয়াঘাটায় মামাতো ভাই সিজার মোল্লার বাড়িতে নিয়ে যান। সেখানে ১৯ আগস্ট দুজনে মিলে তাঁকে হত্যা করেন। পরিচয় গোপন রাখতে মরদেহের মাথা কেটে ফেলে পোশাক খুলে নদীতে ফেলে দেওয়া হয়।
গত ১৯ ডিসেম্বর প্রযুক্তির সহায়তায় লালন গাজীকে গ্রেপ্তার করা হয়। আদালতে ১৬৪ ধারায় দেওয়া জবানবন্দিতে তিনি হত্যার দায় স্বীকার করেন। পরে দীর্ঘ চেষ্টার পর গত ১ মার্চ রাজধানীর হাতিরঝিল থানার মগবাজার এলাকা থেকে সিজার মোল্লাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁর দেওয়া তথ্যে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত একটি হাঁসুয়া উদ্ধার করা হয়েছে। ২ মার্চ আদালতে সিজারও স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।
পিবিআই জানিয়েছে, তদন্ত শেষ পর্যায়ে রয়েছে। প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হবে।
নিহতের ছেলে শামীম ফকির বলেন, “মাকে তো আর ফিরে পাব না। তবে হত্যাকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তি হলে কিছুটা হলেও শান্তি পাব।”
এই নির্মম হত্যাকাণ্ডে এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। প্রেম, প্রতারণা ও টাকার লোভ—সব মিলিয়ে এক বছরের সম্পর্কের পরিণতি হলো নৃশংস খুন, যা শেষ পর্যন্ত উন্মোচিত হলো একটি মেহেদি দেওয়া হাত ও একটি আংটির সূত্র ধরে।