রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে মর্মান্তিক বাস দুর্ঘটনায় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের সাক্ষী হলেন ঝিনাইদহের শৈলকুপার নুরুজ্জামান। ফেরিতে দাঁড়িয়ে তিনি দেখলেন—তার চোখের সামনেই স্ত্রী ও শিশু সন্তানকে নিয়ে যাত্রীবাহী বাসটি পদ্মা নদীতে তলিয়ে যাচ্ছে। মুহূর্তেই ঈদের আনন্দ পরিণত হয় অসহনীয় শোকে।
বুধবার (২৫ মার্চ) বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে এই দুর্ঘটনা ঘটে। কুমারখালী থেকে ছেড়ে আসা সৌহার্দ্য পরিবহনের বাসটি ফেরিতে ওঠার সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পন্টুন থেকে নদীতে পড়ে যায়।
নুরুজ্জামান ওই দিন দুপুর আড়াইটার দিকে কুমারখালী থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দেন। সঙ্গে ছিলেন তার স্ত্রী আয়েশা আক্তার এবং দুই শিশু সন্তান—চার বছরের নাওয়ারা ও আট মাসের আরশান।
ঘাটে পৌঁছে ফেরিতে ওঠার সময় তিনি বড় সন্তানকে নিয়ে বাস থেকে নেমে যান। কিন্তু স্ত্রী ও ছোট সন্তান বাসেই ছিলেন। ঠিক সেই মুহূর্তেই ঘটে বিপর্যয়—তার চোখের সামনে বাসটি নদীতে ডুবে যেতে থাকে।
নুরুজ্জামানের প্রতিবেশী ইলিয়াস হোসেন জানান, ঘটনাটি ফোনে জানাতে গিয়ে তিনি বারবার ভেঙে পড়ছিলেন। পরিবারের অন্য সদস্যরা খবর পেয়ে ঘটনাস্থলের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছেন।
নুরুজ্জামান নিজেই বলেন,
“আমি আর বড় মেয়ে নেমে যাই। আমার স্ত্রী আর ছোট মেয়ে বাসেই ছিল। হঠাৎ করে বাসটা নদীতে পড়ে যায়। এখনো তাদের কোনো খোঁজ পাইনি।”
তার এই বর্ণনা যেন এক অসহায় পিতার আর্তনাদ—যেখানে সামনে দাঁড়িয়ে থেকেও প্রিয়জনকে বাঁচাতে পারেননি তিনি।
যাত্রীসংখ্যা নিয়ে ভিন্ন তথ্য
পরিবহন সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বাসটি প্রথমে কুমারখালী থেকে কয়েকজন যাত্রী নিয়ে ছেড়ে আসে। পথে বিভিন্ন স্থান থেকে যাত্রী ওঠায় মোট যাত্রী সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ৫০ জনে, যদিও বাসটির আসন ছিল ৪০টি।
সৌহার্দ্য পরিবহনের রাজবাড়ী কাউন্টারের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জানান, দুর্ঘটনার সময় বাসে কয়েক ডজন যাত্রী ছিলেন। তবে চালক ও সহকারীর সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না।
দূর্ঘটনার পর ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল উদ্ধার অভিযান শুরু করে। এ পর্যন্ত কয়েকজনকে উদ্ধার করে গোয়ালন্দ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে। তবে এখনও অনেকে নিখোঁজ রয়েছেন বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
ঘাট কর্তৃপক্ষ জানায়, বাসটি যে স্থানে নদীতে পড়ে সেখানে পানির গভীরতা বেশি হওয়ায় উদ্ধারকাজ জটিল হয়ে পড়েছে। উদ্ধারকারী জাহাজ ‘হামজা’ ঘটনাস্থলে কাজ করছে, তবে এখনো বাসটি সম্পূর্ণ উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারজানা জানান, কুমারখালী থেকে ৮ জন যাত্রী বাসে উঠেছিলেন, তাদের মধ্যে তিনজন এখনো নিখোঁজ রয়েছেন।
এই দুর্ঘটনা শুধু একটি সড়ক দুর্ঘটনা নয়—এটি বহু পরিবারের স্বপ্নভঙ্গের এক নির্মম অধ্যায়। নুরুজ্জামানের মতো অনেকেই এখন অপেক্ষায়—হয়তো প্রিয়জন ফিরে আসবে, অথবা অন্তত একটি খোঁজ মিলবে…