বিরোধী দলের তীব্র আপত্তি উপেক্ষা করে জাতীয় সংসদে এমন কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিল পাস হয়েছে, যার মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্টে বিচারক নিয়োগ, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় এবং মানবাধিকার কমিশনসংক্রান্ত অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা অধ্যাদেশ বাতিল করা হয়েছে। এর ফলে বিচার বিভাগ ও মানবাধিকার কমিশনের স্বাধীন কার্যক্রম নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
নতুন আইনের ফলে উচ্চ আদালতের বিচারক নিয়োগের ক্ষমতা আবারও প্রধানমন্ত্রীর হাতে ফিরে যাবে। একই সঙ্গে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় বিলুপ্ত হওয়ায় নিম্ন আদালতের বিচারকদের নিয়োগ, পদোন্নতি ও বদলির নিয়ন্ত্রণ আবার আইন মন্ত্রণালয়ের অধীনে চলে আসবে।
এছাড়া মানবাধিকার কমিশন সম্পর্কিত ২০০৯ সালের আইন পুনরায় কার্যকর করা হয়েছে। ফলে কমিশনের ক্ষমতা সীমিত হয়ে পড়বে—বিশেষ করে সরকারি কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে সরাসরি তদন্তের ক্ষমতা থাকবে না। কমিশন কেবল সরকারের কাছে প্রতিবেদন দিতে ও শাস্তির সুপারিশ করতে পারবে, তবে তা বাস্তবায়ন বাধ্যতামূলক নয়।
সংসদে ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (রহিতকরণ ও পুনঃপ্রচলন) বিল, ২০২৬’ উত্থাপন করেন আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে কণ্ঠভোটে বিলটি পাস হয়। তবে এনসিপির সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ এর বিরোধিতা করেন, যা পরে নাকচ হয়ে যায়।
হাসনাত আবদুল্লাহ অভিযোগ করেন, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলানোর কারণে অনেক দলের অবস্থানও পরিবর্তিত হয়েছে। তাঁর মতে, ২০০৯ সালের আইনে ফিরে যাওয়া মানে মানবাধিকার কমিশনকে আবারও রাজনৈতিক দমনপীড়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার সুযোগ তৈরি করা।
তিনি আরও বলেন, অতীতে এই আইনের আওতায় বিরোধী দল ও ভিন্নমত দমনে কমিশনকে ব্যবহার করা হয়েছে। এমনকি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকাণ্ডকে বৈধতা দেওয়ার অভিযোগও তুলেন তিনি। কমিশনের গঠন প্রক্রিয়াতেও সরকারের প্রভাব বেশি বলে দাবি করেন তিনি, যেখানে অধিকাংশ সদস্যই সরকারঘনিষ্ঠ।
বিরোধিতার জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, ২০০৯ সালের আইনে ফিরে যাওয়ার উদ্দেশ্য স্থায়ীভাবে পুরোনো কাঠামোতে থাকা নয়; বরং নতুন অধ্যাদেশ নিয়ে আরও বিশ্লেষণ ও পরামর্শের সুযোগ তৈরি করা।
তিনি দাবি করেন, ২০২৫ সালের অধ্যাদেশে কিছু অস্পষ্টতা রয়েছে—যেমন অভিযোগ তদন্তের সময়সীমা নির্ধারণ, তদন্ত প্রক্রিয়ার কাঠামো, এবং কমিশনের ভূমিকা নিয়ে স্পষ্ট নির্দেশনার অভাব। এসব কারণে ভুক্তভোগীরা সমস্যায় পড়তে পারেন।
গুম-সংক্রান্ত আইন নিয়েও তিনি বলেন, প্রস্তাবিত কাঠামো যথেষ্ট পরিষ্কার নয় এবং তা আরও যাচাই-বাছাই প্রয়োজন।
একই বৈঠকে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় ও বিচারক নিয়োগসংক্রান্ত অধ্যাদেশ বাতিল করা হয়। এতে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সংকুচিত হতে পারে বলে অভিযোগ ওঠে।
জামায়াতের সদস্য নাজিবুর রহমান এই বিলকে বিচার বিভাগের ওপর ‘নগ্ন হস্তক্ষেপ’ বলে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, আগে বিচার বিভাগ স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারলেও এখন আবার প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ফিরে আসছে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, আদালতের একটি রায়ে সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ পরিবর্তনকে অসাংবিধানিক বলা হয়েছিল। সেই প্রেক্ষাপটে অধ্যাদেশ বাতিল করাকে তিনি প্রশ্নবিদ্ধ করেন।
আইনমন্ত্রী বলেন, কোনো আইন অসাংবিধানিক কি না তা নির্ধারণের ক্ষমতা আদালতের থাকলেও সংসদ আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে স্বাধীন। তিনি দাবি করেন, সরকার বিচার বিভাগের স্বাধীনতা বজায় রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
তিনি অতীতের কিছু বিচারিক অনিয়মের কথা তুলে ধরে বলেন, বিচার বিভাগকে আরও স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করতে সংস্কার প্রয়োজন।
বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ বাতিলের বিরোধিতা করে এনসিপির সদস্য আখতার হোসেন বলেন, অতীতে রাজনৈতিক প্রভাবের মাধ্যমে অযোগ্য ব্যক্তিদের বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। বর্তমান ব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শের কারণে সেই প্রভাব অব্যাহত থাকতে পারে।
আইনমন্ত্রী তার জবাবে বলেন, অতীতে রাজনৈতিক প্রভাব ছিল—এটি অস্বীকার করা যায় না। তবে বর্তমান সরকার বিচারক নিয়োগ প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করতে কাজ করছে।
সব আলোচনা ও আপত্তি শেষে কণ্ঠভোটে বিলগুলো পাস হয়। বিরোধী সদস্যদের আপত্তি কার্যত নাকচ হয়ে যায়। পরে স্পিকার সংসদকে জানান, এক বিচারপতির নামের সঙ্গে যুক্ত একটি বিশেষণ কার্যবিবরণী থেকে মুছে ফেলা হয়েছে।
২৭/২, দূর্গাপুর, উপর রাজারামপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৬৩০০
২০২৫ © দৈনিক অধিকার কতৃক সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত