এসএসসি পরীক্ষার ঠিক আগমুহূর্তে মাদারীপুরের একটি বিদ্যালয়ে ঘটেছে চাঞ্চল্যকর অনিয়মের অভিযোগ। প্রবেশপত্র দেওয়ার নামে বিপুল অঙ্কের টাকা নেওয়ার পর উধাও হয়ে গেছেন এক শিক্ষক ও এক অফিস সহকারী। এতে পরীক্ষা থেকে বঞ্চিত হওয়ার শঙ্কায় ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন অন্তত ২০ জন অকৃতকার্য শিক্ষার্থী।
সোমবার (২০ এপ্রিল) বেলা ১১টার দিকে সদর উপজেলার মস্তফাপুর বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ে টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করেন ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা। এ সময় তারা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষককে অবরুদ্ধ করে প্রবেশপত্রের দাবি জানান।
অভিযোগ রয়েছে, বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক (খণ্ডকালীন) সোহেল মোড়ল ও অফিস সহায়ক নূর-ই আলম লিটন নির্বাচনী পরীক্ষায় অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ফরম পূরণের আশ্বাস দিয়ে জনপ্রতি ১৫ হাজার টাকা করে নেন। প্রায় ২০ জন শিক্ষার্থীর কাছ থেকে মোট প্রায় ৩ লাখ টাকা সংগ্রহ করা হয়। বিনিময়ে পরীক্ষার আগে প্রবেশপত্র দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত তারা কোনো প্রবেশপত্র পাননি।
শিক্ষার্থী ও স্থানীয় সূত্র জানায়, তিন মাস আগে অনুষ্ঠিত নির্বাচনী পরীক্ষায় ১৪০ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ৬৪ জন উত্তীর্ণ হয়। বাদ পড়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে থেকে কিছু শিক্ষার্থীর কাছ থেকে অর্থ নেওয়া হয় প্রবেশপত্র নিশ্চিত করার নামে। কিন্তু পরীক্ষার আগের দিন রবিবার সকালে শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে এসে জানতে পারেন, তাদের কোনো প্রবেশপত্র আসেনি।
এরপর থেকেই শুরু হয় উত্তেজনা। শিক্ষার্থীরা প্রথমে বিদ্যালয়ের ভেতরে বিক্ষোভ করেন এবং পরে সোমবার সকালে মাঠে টায়ার জ্বালিয়ে প্রতিবাদ জানান। তারা দ্রুত প্রবেশপত্র প্রদানের দাবি জানিয়ে দোষীদের শাস্তির দাবি তোলেন।
ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী শান্তা আক্তার বলেন, “আমরা দুই বিষয়ে ফেল করেছিলাম। আমাদের বলা হয়েছিল টাকা দিলে ফরম ফিলাপ হয়ে যাবে। স্যার নিশ্চয়তা দিয়েছিলেন প্রবেশপত্র দেবেন। এখন তিনি উধাও। আগামীকাল পরীক্ষা—আমরা কি তাহলে বসতে পারব না?”
আরেক শিক্ষার্থী আবৃত্তি শিকদার বলেন, “আমাদের শুধু ঘুরানো হয়েছে। আজ না কাল করে সময় পার করেছে। এখন পরীক্ষা দরজায়, অথচ প্রবেশপত্র নেই। আমরা ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় আছি।”
ঘটনার পর থেকে অভিযুক্ত সহকারী শিক্ষক সোহেল মোড়ল ও অফিস সহকারী নূর-ই আলম লিটন পলাতক রয়েছেন। তাদের বাড়িতে গিয়েও কাউকে পাওয়া যায়নি এবং মোবাইল ফোনও বন্ধ পাওয়া গেছে।
বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক মিজানুর রহমান খান বলেন, “ওই শিক্ষক টাকা নিয়ে পলাতক। আমরা তার এই কাজের বিচার চাই। আমাদের নিয়মিত ও অনিয়মিত মিলিয়ে ১২০ জন শিক্ষার্থীর ফরম পূরণ করা হয়েছে, তাদের সবার প্রবেশপত্র এসেছে। এর বাইরে যা হয়েছে, তা আমাদের জানা ছিল না।”
খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে যান সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ওয়াদিয়া শাবাব ও পুলিশ সদস্যরা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে তিনি অভিযুক্ত শিক্ষক ও অফিস সহকারীকে সাময়িক বহিষ্কারের নির্দেশ দেন। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের টাকা ফেরত দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয় এবং পুরো ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠনের কথা জানানো হয়।
ইউএনও ওয়াদিয়া শাবাব বলেন, “প্রবেশপত্র দেওয়ার নামে অর্থ নেওয়ার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুতর। আমরা তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিয়েছি। শিক্ষার্থীদের ক্ষতি পুষিয়ে দিতে এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে তদন্ত চলছে।”
এদিকে ১৩ জন শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। তারা অতিরিক্ত অর্থ আদায় ও অভিযুক্তদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
একটি জাতীয় পরীক্ষার আগে এমন প্রতারণা শুধু অনৈতিকই নয়, শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে নির্মম খেলাও বটে। প্রশ্ন উঠছে—কিছু অসাধু ব্যক্তির কারণে কি মেধাবী শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন ভেঙে যাবে? এখন সবার নজর প্রশাসনের দিকে—ন্যায়বিচার কত দ্রুত নিশ্চিত হয়।
২৭/২, দূর্গাপুর, উপর রাজারামপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৬৩০০
২০২৫ © দৈনিক অধিকার কতৃক সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত