দেশে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে শিশুমৃত্যুর সংখ্যা ও শ্রেণিবিন্যাস ঘিরে জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যেসব শিশুর মধ্যে হামের উপসর্গ দেখা গেছে, তাদের মৃত্যুকেও হামজনিত মৃত্যু হিসেবেই বিবেচনা করা উচিত।
সম্প্রতি ১২ এপ্রিল অনুষ্ঠিত ন্যাশনাল ইমুনাইজেশন অ্যান্ড টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজরি গ্রুপ (নাইট্যাগ) ও ন্যাশনাল ভেরিফিকেশন কমিটি (এনভিসি)-এর যৌথ সভায় এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। সভায় বিশেষজ্ঞরা মত দেন, হামের উপসর্গ থাকা মানেই ওই ব্যক্তি হাম রোগে আক্রান্ত—এবং সেই ভিত্তিতে মৃত্যুকেও হামজনিত হিসেবে গণ্য করা যৌক্তিক।
বর্তমানে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর মৃত্যুর তথ্য দুইভাবে শ্রেণিবিন্যাস করছে—‘নিশ্চিত’ ও ‘সন্দেহজনক’। যেসব ক্ষেত্রে ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় হাম শনাক্ত হয়, সেগুলোকে নিশ্চিত মৃত্যু হিসেবে ধরা হচ্ছে। আর পরীক্ষার সুযোগ না থাকলে বা নমুনা সংগ্রহ না হলে সেগুলোকে ‘সন্দেহজনক’ হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিভাজনই সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তির অন্যতম কারণ। কারণ বাস্তবে সব আক্রান্ত শিশুর নমুনা পরীক্ষা করা সম্ভব হয় না, ফলে প্রকৃত পরিস্থিতি অনেক সময় আড়ালেই থেকে যায়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সমন্বিত নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে ‘সন্দেহজনক’ হামে মৃত্যু হয়েছে ১৯৪ জনের এবং ‘নিশ্চিত’ হামে মৃত্যু ৩৯ জন। অর্থাৎ মোট ২৩৩ শিশুর মৃত্যু হাম-সংশ্লিষ্ট বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এর আগে মার্চ মাসের তৃতীয় সপ্তাহে সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল থেকে ২২ জনের মৃত্যুর তথ্য জানানো হয়েছিল। পরবর্তীতে ১৯ এপ্রিল জানানো হয়, সন্দেহজনক মৃত্যু ৩২ এবং নিশ্চিত মৃত্যু ২—যা তথ্য উপস্থাপনায় অসামঞ্জস্য তৈরি করেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
নাইট্যাগের চেয়ারপারসন বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ফেরদৌসী কাদরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় উপস্থিত জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলেন, উপসর্গভিত্তিক রোগ নির্ণয় মহামারির সময় একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি। বিশেষ করে যেখানে ল্যাব সুবিধা সীমিত, সেখানে উপসর্গই রোগ শনাক্তের প্রধান ভিত্তি।
জনস্বাস্থ্যবিদ ও আইইডিসিআর-এর সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মুশতাক হোসেন বলেন,
“হামের উপসর্গ থাকলেই তাকে হাম রোগী হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। ‘সন্দেহজনক’ শব্দটি মানুষের মনে দ্বিধা তৈরি করে এবং প্রকৃত পরিস্থিতি সম্পর্কে ভুল ধারণা দেয়। এই বিভ্রান্তি প্রাদুর্ভাব মোকাবেলাকে আরও কঠিন করে তোলে।”
তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (উন্নয়ন) অধ্যাপক ফোয়ারা তাসমীন বলেন,
“ধরে নেওয়া যায়, অধিকাংশ মৃত্যুই হামে আক্রান্তদের। তবে ল্যাবরেটরি পরীক্ষা ছাড়া সবাই হামেই মারা গেছে—এভাবে বলা বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক নয়। ১০০ জনের মধ্যে একজনের মৃত্যুর কারণ অন্য কিছু হতে পারে।”
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক রোগ হওয়ায় এর প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে দ্রুত টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করা জরুরি। একই সঙ্গে তথ্য প্রকাশে স্বচ্ছতা ও একরূপতা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে জনমনে বিভ্রান্তি না ছড়ায়।
তাদের মতে, “ডেটা ব্যবস্থাপনায় অস্পষ্টতা থাকলে শুধু জনসাধারণ নয়, নীতিনির্ধারণ পর্যায়েও ভুল সিদ্ধান্তের ঝুঁকি তৈরি হয়।”
হাম প্রতিরোধযোগ্য একটি রোগ হলেও তথ্যের বিভ্রান্তি, টিকাদানে ঘাটতি এবং নজরদারির সীমাবদ্ধতা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলতে পারে। তাই সঠিক তথ্য, দ্রুত শনাক্তকরণ এবং সমন্বিত উদ্যোগই হতে পারে এই জনস্বাস্থ্য সংকট মোকাবেলার প্রধান হাতিয়ার।
২৭/২, দূর্গাপুর, উপর রাজারামপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৬৩০০
২০২৫ © দৈনিক অধিকার কতৃক সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত