মানুষ স্বভাবগতভাবেই ভোগ-বিলাস ও বাহ্যিক জৌলুসের প্রতি আকৃষ্ট। দুনিয়ার সম্পদ, আরাম-আয়েশ ও চাকচিক্য তাকে সহজেই মোহিত করে। তবে এই আকর্ষণের মধ্যেই লুকিয়ে আছে বড় এক পরীক্ষা—মানুষ কি প্রবৃত্তির অনুসারী হবে, নাকি আত্মসংযম ও আল্লাহভীতির মাধ্যমে নিজেকে সঠিক পথে পরিচালিত করবে?
পবিত্র কোরআনে এ বিষয়ে সতর্ক করে বলা হয়েছে, এমন এক সময় আসবে যখন মানুষ ইবাদত থেকে দূরে সরে গিয়ে নিজেদের খেয়ালখুশির অনুসরণ করবে। এর পরিণতি ভয়াবহ হলেও তাওবা ও ঈমানের মাধ্যমে ফিরে আসার সুযোগ সবসময় উন্মুক্ত রয়েছে (সুরা মারিয়াম: ৫৯-৬০)।
একইভাবে দুনিয়ার মোহে পড়া মানুষের মানসিকতা বোঝাতে কারুনের ঘটনার উল্লেখ করা হয়েছে। বাহ্যিক জাঁকজমক দেখে অনেকে তার মতো হতে চাইলেও জ্ঞানীরা মনে করিয়ে দেন—আল্লাহর কাছে যে প্রতিদান রয়েছে, সেটিই প্রকৃত সফলতা এবং তা অর্জন করে ধৈর্যশীল ঈমানদাররা (সুরা কাসাস: ৮০)।
কোরআন মানুষকে বারবার স্মরণ করিয়ে দেয়, জীবনের প্রতিটি নিয়ামত সম্পর্কে একদিন জবাবদিহি করতে হবে (সুরা তাকাসুর: ৮)। যারা শুধু দুনিয়াকেই লক্ষ্য বানায়, তাদের জন্য আখিরাতে কঠিন পরিণতির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে (সুরা বনি ইসরাঈল: ১৮)।
দুনিয়ার আকর্ষণ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, মানুষকে তার প্রিয় বিষয়—স্ত্রী-সন্তান, সম্পদ, পশুসম্পদ ও শস্যক্ষেত—এসবের প্রতি আকৃষ্ট করা হয়েছে। কিন্তু এগুলো সাময়িক ভোগের বস্তু; স্থায়ী ও উত্তম ঠিকানা আল্লাহর কাছেই (সুরা আলে-ইমরান: ১৪)।
আখিরাতের তুলনায় দুনিয়ার জীবন অত্যন্ত ক্ষণস্থায়ী ও তুচ্ছ। কোরআনে বলা হয়েছে, দুনিয়ার সম্পদ সামান্য, আর মুত্তাকিদের জন্য আখিরাতই উত্তম (সুরা নিসা: ৭৭)। আবার প্রশ্ন করা হয়েছে—মানুষ কি আখিরাতের পরিবর্তে দুনিয়ার জীবনেই সন্তুষ্ট হয়ে গেছে, যদিও দুনিয়ার ভোগবিলাস অত্যন্ত নগণ্য (সুরা তাওবা: ৩৮)।
পার্থিব জীবনকে কোরআনে ক্রীড়া ও কৌতুকের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে, আর আখিরাতকেই প্রকৃত জীবন হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে (সুরা আনকাবুত: ৬৪)।
মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবন ছিল এর বাস্তব উদাহরণ। অভাব-অনটনের মধ্যেও তিনি ধৈর্য ও কৃতজ্ঞতার মাধ্যমে জীবন অতিবাহিত করেছেন। হযরত আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, নবীজির পরিবার কখনো টানা দুই দিন পেটভরে আহার করতে পারেননি (সহিহ বুখারি: ৫৪১৬)। এমনকি কখনো মাসের পর মাস ঘরে আগুন জ্বলত না, খেজুর ও পানি দিয়েই দিন কাটত (সহিহ মুসলিম: ৭৪৪৯)।
এসব শিক্ষা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—প্রাচুর্য নয়, বরং তৃপ্তিই প্রকৃত সুখের উৎস। তাই একজন মুমিনের উচিত সংযমী, ভারসাম্যপূর্ণ ও আল্লাহমুখী জীবন গড়ে তোলা। দুনিয়ার মোহে বিভ্রান্ত না হয়ে আখিরাতের সফলতাকেই জীবনের মূল লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করাই হলো প্রকৃত প্রজ্ঞা।