ময়মনসিংহের বহুল আলোচিত মাদ্রাসা ছাত্রী ধর্ষণ মামলায় অবশেষে নাটকীয় মোড়—দীর্ঘদিন পলাতক থাকার পর প্রধান অভিযুক্ত আমানুল্লাহ মাহমুদী ওরফে সাগরকে গ্রেফতার করেছে র্যাব-১৪। টঙ্গী ও গাজীপুরে লুকিয়ে থেকে শেষ পর্যন্ত গৌরীপুরে আশ্রয় নেওয়া এই অভিযুক্ত প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ও গোয়েন্দা তৎপরতার কাছে হার মানতে বাধ্য হয়।
র্যাব-১৪ এর অতিরিক্ত ডিআইজি (অধিনায়ক) নয়মুল হাসান এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, “অভিযুক্ত অত্যন্ত কৌশলীভাবে নিজেকে আড়াল করার চেষ্টা করে। এমনকি কোনো মোবাইল ফোনও ব্যবহার করেনি, যাতে ট্র্যাক করা না যায়। কিন্তু আমাদের প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ ও গোয়েন্দা তথ্যের সমন্বয়ে তার অবস্থান শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে।”
তিনি আরও জানান, ঘটনার পরপরই আমানুল্লাহ প্রথমে টঙ্গীতে পালিয়ে যায়, পরে গাজীপুরে অবস্থান নেয় এবং সর্বশেষ ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলার সোনামপুর এলাকায় আত্মগোপন করে। অবশেষে ৬ মে ভোরে বিশেষ অভিযানে তাকে গ্রেফতার করা হয়। পরে তাকে সংশ্লিষ্ট থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে এবং তার বিরুদ্ধে আইনগত কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, অভিযুক্ত আমানুল্লাহ মাহমুদী (৩০) মদন উপজেলার একটি কওমি মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা ও শিক্ষক। ভুক্তভোগী শিশু একই এলাকার বাসিন্দা এবং নানির কাছে থেকে ওই মাদ্রাসায় পড়াশোনা করত।
অভিযোগে বলা হয়, ২০২৫ সালের ২ অক্টোবর মাদ্রাসা ছুটির পর অভিযুক্ত শিক্ষক শিশুটিকে কক্ষে ডেকে নিয়ে জোরপূর্বক ধর্ষণ করে। দীর্ঘদিন বিষয়টি গোপন থাকলেও পরবর্তীতে শিশুটির শারীরিক পরিবর্তন দেখে তার মা সন্দেহ করেন। চিকিৎসকের কাছে নেওয়ার পর জানা যায়, সে প্রায় সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা।
পরবর্তীতে শিশুটির কাছ থেকে পুরো ঘটনা জানার পর ভুক্তভোগীর মা বাদী হয়ে ২৩ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে মদন থানায় মামলা দায়ের করেন। মামলায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ (সংশোধনী ২০২০) এর ৯(১) ধারা এবং দণ্ডবিধির ৫০৬ ধারায় অভিযোগ আনা হয়।
ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দার ঝড় ওঠে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিযুক্তের দ্রুত গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি ওঠে। দীর্ঘদিন পলাতক থাকার কারণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছিল।
তবে শেষ পর্যন্ত র্যাব-১৪ এর অভিযানে গ্রেফতার হওয়ায় মামলার তদন্তে নতুন গতি এসেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, এ ধরনের জঘন্য অপরাধে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা না হলে সমাজে ভয়াবহ বার্তা যাবে।
এই ঘটনায় আবারও প্রশ্ন উঠেছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে। বিশেষ করে আবাসিক ও মাদ্রাসাভিত্তিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তদারকি ও জবাবদিহিতা কতটা কার্যকর—তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সচেতন মহল।
তারা বলছেন, শুধুমাত্র গ্রেফতারই যথেষ্ট নয়-এই ধরনের অপরাধ রোধে কঠোর নজরদারি, শিক্ষকদের যাচাই-বাছাই এবং নিয়মিত মনিটরিং জোরদার করা জরুরি।
অভিযুক্তের গ্রেফতার নিঃসন্দেহে একটি বড় অগ্রগতি। তবে ভুক্তভোগীর ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। সমাজের প্রত্যাশা—এই মামলার দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার হোক, যাতে আর কোনো শিশুকে এমন নির্মমতার শিকার হতে না হয়।
২৭/২, দূর্গাপুর, উপর রাজারামপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৬৩০০
২০২৫ © দৈনিক অধিকার কতৃক সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত