চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতি ভবনে সালিশ বৈঠককে কেন্দ্র করে নজিরবিহীন সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। অভিযোগ উঠেছে, বিরোধের জেরে কয়েকজন আইনজীবী ও তাদের সহকারীরা একাধিক ব্যক্তিকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অবরুদ্ধ করে বেধড়ক মারধর করেছেন। হামলায় অন্তত ৭ জন আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে তিনজনের অবস্থা গুরুতর বলে জানিয়েছে পুলিশ।
শুধু তাই নয়, সংবাদ সংগ্রহে গিয়ে এক সাংবাদিককে টেনেহিঁচড়ে তুলে নিয়ে আটকে রেখে লাঞ্ছিত করা হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। পুলিশের এক সদস্যের সঙ্গেও অসদাচরণ, মোবাইল ফোন কেড়ে নেয়া এবং হুমকি দেয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। পুরো ঘটনায় জেলা শহরে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
রোববার (১৭ মে) বিকেল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত জেলা আইনজীবী সমিতি ভবনে এ ঘটনা ঘটে। রাত প্রায় ১২টার দিকে পুলিশ অভিযান চালিয়ে ভবনের ভেতর থেকে আরও দুই তরুণকে আহত ও অবরুদ্ধ অবস্থায় উদ্ধার করে। এর আগে দফায় দফায় আরও কয়েকজনকে উদ্ধার করা হয়।
পুলিশ, হাসপাতাল সূত্র, প্রত্যক্ষদর্শী ও আহতদের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, একটি পারিবারিক ও আর্থিক বিরোধের সালিশকে কেন্দ্র করে প্রথমে ইমাম হাসান বারু নামের এক ব্যক্তির সঙ্গে বাকবিতণ্ডা শুরু হয়। একপর্যায়ে তাকে একটি কক্ষে আটকে মারধর করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে।
খবর পেয়ে তার দুই ছেলে ও পরিচিত কয়েকজন তাকে উদ্ধার করতে গেলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নেয়। অভিযোগ রয়েছে, তাদেরও জোর করে বিভিন্ন কক্ষে আটকে রেখে বেধড়ক মারধর করা হয়। কয়েকজনকে রক্তাক্ত অবস্থায় উদ্ধার করে চাঁপাইনবাবগঞ্জ ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেলা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
আহতদের মধ্যে রয়েছেন জেলা শহরের বালুবাগান এলাকার ইমাম হাসান বারু (৪৬), তার ছেলে রেদওয়ান আহমেদ (২২), হরিমোহন সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির ছাত্র হাসানুল বান্না আকিব (১৪), মমিন আলীর ছেলে জিদান (১৯), সিফাত আলী (১৮), পরশ (১৬) ও কুইক (১৯)। আহতদের বেশিরভাগই স্কুল-কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থী বলে জানা গেছে।

ঘটনার খবর পেয়ে সংবাদ সংগ্রহে যান স্টার নিউজের জেলা প্রতিনিধি মাহমুদুল হাসান তুষার। অভিযোগ রয়েছে, আইনজীবী সমিতির সামনে থেকেই তাকে জোরপূর্বক টেনেহিঁচড়ে দোতলায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তার মোবাইল ফোন ও পরিচয়পত্র কেড়ে নেয়া হয় এবং তাকে দীর্ঘ সময় আটকে রাখা হয়।
অবরুদ্ধ সাংবাদিককে উদ্ধারে কয়েকজন সিনিয়র সাংবাদিক ঘটনাস্থলে গেলে তাদের প্রতিও চড়াও হন অভিযুক্তরা। এ সময় পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
শুধু সাংবাদিকই নন, পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) এক সদস্যকেও হুমকি ও গালিগালাজ করার অভিযোগ উঠেছে। তার মোবাইল ফোনও কেড়ে নেয়া হয় বলে জানা গেছে।
মধ্যরাতে উদ্ধার হওয়া আহত তরুণ সিফাত ও পরশ অভিযোগ করেন, চিকিৎসা শেষে হাসপাতাল থেকে ফেরার পরও তাদের ছাড় দেয়া হয়নি। বরং আবারও আইনজীবী সমিতি ভবনে আটকে রেখে মারধর করা হয়েছে।
তাদের শরীরের বিভিন্ন স্থানে জখমের চিহ্ন দেখা গেছে বলে হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে রাতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। একপর্যায়ে পুলিশ আইনজীবী সমিতি ভবনে প্রবেশ করে আহতদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায় পুলিশ।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ওয়াসিম ফিরোজ জানান,
“এ ঘটনায় মোট ৭ জন আহত হয়েছেন। সবাইকে জেলা হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে দুজন হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে এবং তিনজন গুরুতর আহত।”
তিনি আরও জানান, রাত ১টা পর্যন্ত এ ঘটনায় কোনো মামলা দায়ের হয়নি। তবে পুরো ঘটনা তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।
এদিকে ঘটনার পর থেকেই জেলা আইনজীবী অঙ্গনে উত্তেজনা বিরাজ করছে। অভিযুক্ত আইনজীবীদের বক্তব্য জানার জন্য একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের কাউকে পাওয়া যায়নি।
২৭/২, দূর্গাপুর, উপর রাজারামপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৬৩০০
২০২৫ © দৈনিক অধিকার কতৃক সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত