মাত্র পাঁচ মাস বয়স। পৃথিবীটাকে ঠিকমতো চিনে ওঠার আগেই ছোট্ট সাব্বির আহমেদের শরীরে বাসা বেঁধেছে ভয়ংকর হাম। রাজধানীর মহাখালী ডিএনসিসি হাসপাতালের হাম ওয়ার্ডে হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে কাঁপছে তার ছোট্ট শরীর। তুলতুলে হাতে ক্যানুলা, মুখে অক্সিজেন মাস্ক। সন্তানের নিঃশ্বাসের ওঠানামা দেখছেন বাবা আবদুর রহিম। আর মনে মনে হিসাব কষছেন—কত টাকা ধার হলো, আরও কত লাগবে।
ঘরে থাকা সামান্য সঞ্চয় শেষ। আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ধার নিয়েও কুলাতে পারছেন না। এর মধ্যেই নতুন আঘাত—ছেলের পাশে থাকতে গিয়ে চাকরিটাও হারিয়েছেন সাব্বিরের মা আছিয়া বেগম। টানা ১০ দিন অফিসে যেতে না পারায় তাকে চাকরি ছাড়তে হয়েছে।
রোববার (১৭ মে) রাজধানীর ডিএনসিসি হাসপাতালের হাম ওয়ার্ড ঘুরে দেখা যায়, সাব্বিরের পরিবারের মতো অসংখ্য পরিবার এখন হামের সঙ্গে শুধু সন্তানের জীবন নয়, নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইও করছে। কেউ চিকিৎসার খরচ জোগাতে গরু বিক্রি করছেন, কেউ ধারদেনায় জর্জরিত, আবার কেউ কর্মস্থল হারিয়ে অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিলেও হাম আক্রান্ত একেকটি শিশুর পেছনে প্রতিদিন কয়েক হাজার টাকা খরচ হচ্ছে। ওষুধ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, শিশুখাদ্য, নেবুলাইজার মেশিন, অক্সিজেন মাস্ক—সব মিলিয়ে গড়ে একজন রোগীর পেছনে প্রতিদিন ব্যয় হচ্ছে প্রায় ২ হাজার ১১১ টাকা।
ডিএনসিসি হাসপাতালের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, একজন হাম রোগীকে গড়ে ছয় দিন হাসপাতালে থাকতে হচ্ছে। এতে মোট ব্যয় দাঁড়াচ্ছে প্রায় ১২ হাজার ৬৭০ টাকা। আর জটিলতা দেখা দিলে চিকিৎসা ব্যয় দুই লাখ টাকাও ছাড়িয়ে যাচ্ছে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে আসা শিশুদের অধিকাংশই শ্বাসকষ্টে ভুগছে। অনেককে আইসিইউতে ভর্তি রাখতে হচ্ছে। গড়ে ১৫ দিন পর্যন্ত হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে তাদের।
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এক শিশুর বাবা আতিয়ার রহমান বলেন,
“দুইটা গরু-বাছুর বিক্রি করে এক লাখ টাকার মতো জোগাড় করছি। গ্রামের হাসপাতাল ঘুরে শেষমেশ ঢাকায় আসতে হয়েছে। যাতায়াত, থাকা-খাওয়া, কাজ বন্ধ—সব মিলিয়ে কী অবস্থা, তা বলে বোঝানো যাবে না।”
চিকিৎসকরা বলছেন, হাম এখন শুধু স্বাস্থ্য সংকট নয়, এটি নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য বড় অর্থনৈতিক বিপর্যয়েও রূপ নিচ্ছে।
রাজধানীর খিলগাঁওয়ের তালতলা এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ শাহজাহানের আট মাস বয়সী যমজ কন্যা সাবিহা ও সামিহাও আক্রান্ত হয়েছে হামে। প্রথমে জ্বর, পরে শরীরে র্যাশ ও খিঁচুনি দেখা দেয়। বর্তমানে তারা রাজধানীর ঢাকা কমিউনিটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
পোশাকের দোকানের বিক্রয়কর্মী শাহজাহান বলেন,
“দুই মেয়ের একই অবস্থা। বাসায় রেখে চিকিৎসা করানোর সাহস পাইনি। এরই মধ্যে ১০ হাজার টাকার বেশি খরচ হয়ে গেছে। আমার মতো মানুষের জন্য এটা অনেক বড় চাপ।”
তিনি বলেন,
“খবরে যখন শুনি হাম হয়ে বাচ্চারা মারা যাচ্ছে, তখন নিজের মেয়েদের কথা ভেবে বুক কেঁপে ওঠে। এখন শুধু আল্লাহর কাছে দোয়া করি, ওরা যেন সুস্থ হয়ে যায়।”
ঢাকা কমিউনিটি হাসপাতালের হাম ইউনিটে বর্তমানে কয়েক মাস থেকে আড়াই বছর বয়সী শিশুরা চিকিৎসাধীন রয়েছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত সেখানে কোনো হাম রোগীর মৃত্যু হয়নি।
দেশজুড়ে হামের প্রকোপ বাড়তে থাকায় সাধারণ জ্বর-সর্দিতেও আতঙ্কিত হয়ে পড়ছেন অভিভাবকরা।
চার বছর বয়সী ছেলেকে নিয়ে হাসপাতালে আসা ফাতেমা আক্তার বলেন,
“আগে হলে বাসায় নাপা খাইয়ে রাখতাম। কিন্তু এখন টিভিতে হামের খবর দেখে ভয় লাগছে। তাই ডাক্তার দেখাতে চলে এসেছি।”
রিকশাচালক আবদুল মজিদও দেড় বছরের মেয়েকে নিয়ে হাসপাতালে ছুটে এসেছেন।
“আশপাশের মানুষ কইতেছে হামে নাকি বাচ্চা মারা যাইতেছে। মাইয়ার গা গরম দেখে রাতে ঘুমাইতে পারি নাই,” বলেন তিনি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে হাম ও হামের উপসর্গে আরও ৬ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে একজনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছিল। একই সময়ে নতুন করে ১ হাজার ৫১৭ শিশু আক্রান্ত হয়েছে।
গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত দেশে হাম ও হামের উপসর্গে মোট ৪৫৯ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ৭৫ জনের শরীরে হাম নিশ্চিত হয়েছিল। একই সময়ে আক্রান্ত হয়েছে ৫৭ হাজার ৮৪৬ শিশু এবং হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৪২ হাজারের বেশি রোগী।
স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, অপুষ্টি, মাতৃদুগ্ধ না পাওয়া এবং সচেতনতার অভাবে শিশুরা বেশি আক্রান্ত হচ্ছে।
রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়োজিত এক সেমিনারে তিনি বলেন,
“আগে ধারণা ছিল, ৬ থেকে ৯ মাস বয়স পর্যন্ত শিশুর শরীরে মায়ের দুধের মাধ্যমে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা থাকে। কিন্তু এখন সেই বয়সী শিশুরাও হাম আক্রান্ত হচ্ছে।”
তিনি আরও জানান, হাম-পরবর্তী জটিলতায় অধিকাংশ শিশু নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে হাম সেরে যাওয়ার পরও সেকেন্ডারি ইনফেকশনে মৃত্যু ঘটছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ বলেন,
“এই দুর্মূল্যের বাজারে হামের চিকিৎসায় এক থেকে দেড় লাখ টাকা ব্যয় করা দরিদ্র পরিবারের জন্য ভয়াবহ চাপ। অনেক পরিবার জোড়াতালি দিয়ে পরিস্থিতি সামলানোর চেষ্টা করছে।”
তিনি হাসপাতালগুলোতে জরুরি রোগী সহায়তা তহবিল গঠনের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন।
চিকিৎসকরা বলছেন, হাম প্রতিরোধে নিয়মিত টিকাদান, শিশুকে মাতৃদুগ্ধ পান করানো, পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করা এবং দ্রুত চিকিৎসা নেয়াই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অন্যথায় স্বাস্থ্য সংকটের পাশাপাশি আরও বড় সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে হাজারো পরিবার।
২৭/২, দূর্গাপুর, উপর রাজারামপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৬৩০০
২০২৫ © দৈনিক অধিকার কতৃক সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত