নাটোরজুড়ে যেন গড়ে উঠেছে অনিয়ন্ত্রিত বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের এক অঘোষিত সাম্রাজ্য। স্বাস্থ্য বিভাগের বৈধ সনদ, প্রশিক্ষিত চিকিৎসক, দক্ষ নার্স কিংবা প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম ছাড়াই জেলার বিভিন্ন এলাকায় চলছে চিকিৎসার নামে বাণিজ্য। শহর থেকে উপজেলা—প্রায় সর্বত্রই রোগীদের জীবন নিয়ে চলছে ভয়ংকর ঝুঁকির খেলা।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, জেলায় বর্তমানে ১৭৮টি বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার রয়েছে। এর মধ্যে অন্তত ১২৫টি প্রতিষ্ঠানের নেই হালনাগাদ লাইসেন্স। অথচ সেসব প্রতিষ্ঠানেই প্রতিদিন চলছে অস্ত্রোপচার, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসাসেবা। কোথাও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, কোথাও নেই জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থা, আবার কোথাও ভুল রোগ নির্ণয় ও অবহেলায় বিপন্ন হচ্ছেন রোগীরা।
অভিযোগ উঠেছে, স্বাস্থ্য বিভাগের নজরদারি কার্যত কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ। মাঝে মধ্যে নামমাত্র অভিযান চালিয়ে জরিমানা করা হলেও কিছুদিন পর আবার আগের মতোই শুরু হয়ে যায় কার্যক্রম। ফলে সাধারণ মানুষ বাধ্য হয়ে অনিরাপদ চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করছেন।
সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, নাটোর সদর উপজেলায় ৭১টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বৈধ ও হালনাগাদ সনদ রয়েছে মাত্র ২৩টির। সিংড়ায় ৮টির মধ্যে ৩টি, গুরুদাসপুরে ২৪টির মধ্যে মাত্র ৪টি, বড়াইগ্রামে ৩৭টির মধ্যে ৯টি, লালপুরে ২৪টির মধ্যে ৮টি, বাগাতিপাড়ায় ৬টির মধ্যে ৪টি এবং নলডাঙ্গায় ৮টির মধ্যে মাত্র ২টি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স হালনাগাদ রয়েছে।
এই পরিসংখ্যানই বলে দিচ্ছে, জেলার স্বাস্থ্য খাত কতটা নিয়ন্ত্রণহীনভাবে পরিচালিত হচ্ছে।
সরেজমিনে শহরের বিভিন্ন ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার ঘুরে দেখা গেছে চরম অব্যবস্থাপনা। অনেক প্রতিষ্ঠানের সামনে লাইসেন্স নম্বর পর্যন্ত টাঙানো নেই। কোথাও পোস্ট-অপারেটিভ রুম নেই, কোথাও নেই পর্যাপ্ত প্রশিক্ষিত নার্স বা টেকনিশিয়ান।
জনসেবা হাসপাতাল, পদ্মা ডায়াগনস্টিক সেন্টার, প্রাইম ডায়াগনস্টিক সেন্টার, শেফা ক্লিনিক ও আস্থা ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড হাসপাতালসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ন্যূনতম মানদণ্ডের ঘাটতি পাওয়া গেছে। অভিযোগ রয়েছে, কাগজপত্রে নানা সুযোগ-সুবিধা দেখিয়ে অনুমোদন নেওয়া হলেও বাস্তবে সেগুলোর অনেক কিছুই নেই।
বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ) নাটোর শাখার সদস্য সচিব ডা. আবুল কালাম আজাদ বলেন, “প্রশিক্ষিত জনবল ও মানসম্মত যন্ত্রপাতি ছাড়া চিকিৎসা কার্যক্রম রোগীর জীবনের জন্য বড় ধরনের হুমকি। কিন্তু বিএমএর সরাসরি ব্যবস্থা নেওয়ার আইনি ক্ষমতা নেই।”
অবৈধ ও অনিয়ন্ত্রিত চিকিৎসাসেবার কারণে জেলায় একের পর এক অভিযোগ উঠছে ভুল চিকিৎসা ও অবহেলায় মৃত্যুর।
গত ১১ জানুয়ারি শহরের প্রাইম ডায়াগনস্টিক সেন্টারে সাবিহা খাতুনের সিজার অপারেশন করা হয়। পরে তার অবস্থার অবনতি হলে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে দায়িত্বরত চিকিৎসক ভুল চিকিৎসার অভিযোগ তোলেন। পরে বিষয়টি ধামাচাপা দিতে রোগীর পরিবারকে ৫০ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
আরেক ঘটনায় শহরের চকরামপুর এলাকার শিরিন আক্তারকে গত ২৯ এপ্রিল ইসলামী হাসপাতালে সিজারের জন্য ভর্তি করা হয়। অপারেশনের তিন দিন পর তাকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়। কিন্তু বাড়ি ফেরার পরই তার হাত-পা অবশ হয়ে পড়ে। অবস্থার অবনতি হলে আবার হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তরের পর আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি। স্বজনদের অভিযোগ, চিকিৎসার অবহেলাই তার মৃত্যুর কারণ।
তবে ইসলামী হাসপাতালের পরিচালক আতিকুল ইসলাম রাসেল অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “নিয়ম মেনেই রোগীকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছিল।”
ক্লিনিক মালিকদের অভিযোগ, পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র পেতে নানা জটিলতা ও বৈষম্যের শিকার হতে হয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন পরিচালক দাবি করেন, একই ধরনের আবেদন করেও কেউ দ্রুত ছাড়পত্র পান, আবার কেউ বছরের পর বছর অপেক্ষা করেন। তাদের ভাষ্য, ‘সমঝোতা’ হলে অনেক শর্তই সহজ হয়ে যায়।
তারা আরও অভিযোগ করেন, তরল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বা সংরক্ষণাগারের শর্ত পুরোপুরি পূরণ না করেও অনেক প্রতিষ্ঠান অনুমোদন পেয়েছে।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন নাটোর পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক রফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, “শর্ত পূরণ ছাড়া কাউকে ছাড়পত্র দেওয়া হয় না।”
জেলা প্রশাসনের তথ্য বলছে, ২০২৫ সালে জেলায় বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিরুদ্ধে মাত্র তিনটি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়েছে। এতে তিনটি প্রতিষ্ঠানকে মোট ৪৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। অথচ ২০২৬ সালে এখন পর্যন্ত কোনো অভিযান বা প্রতিষ্ঠান সিলগালার তথ্য পাওয়া যায়নি।
নাটোর সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) সভাপতি অধ্যক্ষ আব্দুর রাজ্জাক বলেন, “নিয়মিত কঠোর মনিটরিং না থাকায় অবৈধ ক্লিনিকগুলো বহাল তবিয়তে চলছে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ।”
অন্যদিকে বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক অ্যাসোসিয়েশনের নেতা আব্দুল আওয়াল রাজা লাইসেন্স প্রক্রিয়া সহজ ও স্বচ্ছ করার দাবি জানিয়েছেন।
নাটোর সিভিল সার্জন ডা. মুহাম্মদ মশিউর রহমান দাবি করেছেন, শর্ত পূরণ না করলে কোনো প্রতিষ্ঠানের সনদ নবায়ন করা হচ্ছে না। অবৈধ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলেও জানান তিনি। তবে সাম্প্রতিক ভ্রাম্যমাণ আদালতের তথ্য চাইলে তা দেখাতে পারেননি।
রাজশাহী স্বাস্থ্য বিভাগের পরিচালক ডা. হাবিবুর রহমান বলেন, “যেসব প্রতিষ্ঠানের বৈধ কাগজপত্র নেই, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
তবে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—অবৈধ ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের এই দৌরাত্ম্য বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ কবে দেখা যাবে, আর কত প্রাণ গেলে নড়েচড়ে বসবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ?
২৭/২, দূর্গাপুর, উপর রাজারামপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৬৩০০
২০২৫ © দৈনিক অধিকার কতৃক সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত