ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে রাজধানী ছেড়ে ঘরে ফিরতে শুরু করেছেন দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ। সড়ক ও রেলপথের পাশাপাশি নৌপথেও বাড়ছে ঘরমুখো যাত্রীর চাপ। রাজধানীর সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল এখন যেন এক বিশাল জনসমুদ্র। পরিবার-পরিজন নিয়ে গ্রামের বাড়িতে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে যাত্রীরা ভিড় করছেন লঞ্চঘাটে। যাত্রীদের চাপ সামাল দিতে এবার বিশেষ লঞ্চ সার্ভিস চালুর পাশাপাশি সদরঘাটের বাইরে নতুন দুটি ঘাট থেকেও লঞ্চ চলাচল শুরু করেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এবারের ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) আগেভাগেই ব্যাপক প্রস্তুতি নেয়। সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল থেকে বর্তমানে ১৭২টি লঞ্চের মাধ্যমে দক্ষিণাঞ্চলের ২১ জেলার যাত্রী পরিবহন করা হচ্ছে। সাধারণ সময়ে যেখানে ৫০ থেকে ৫৫টি লঞ্চ চলাচল করে, সেখানে ঈদ উপলক্ষে অতিরিক্ত লঞ্চ যুক্ত করে সার্ভিস প্রায় দ্বিগুণ করা হয়েছে।
রোববার সরেজমিন সদরঘাট ঘুরে দেখা যায়, সরকারি ছুটি শুরুর আগের দিন সকাল থেকেই যাত্রীরা টার্মিনালে আসতে শুরু করেছেন। বিকেলের পর থেকে ভিড় আরও বাড়তে থাকে। কেউ পরিবারের সদস্যদের নিয়ে, কেউবা হাতে ব্যাগ-লাগেজ নিয়ে দীর্ঘ যাত্রার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। আজ সোমবার থেকে যাত্রীচাপ আরও বাড়বে বলে ধারণা করছে কর্তৃপক্ষ। ঈদের আগের দিন ২৭ মে পর্যন্ত এ ভিড় অব্যাহত থাকবে।
ঈদযাত্রাকে স্বস্তিদায়ক করতে অনেক রুটে সরকার নির্ধারিত ভাড়ার চেয়েও কম ভাড়া নেওয়ার দাবি করেছেন লঞ্চ মালিকরা। ঢাকা-বরিশাল-ঢাকা রুটে চলাচলকারী পারাবত-২ লঞ্চের ম্যানেজার মোহাম্মদ সুমন বলেন, “যাত্রীদের সুবিধার্থে কেবিন ভাড়া উল্লেখযোগ্য হারে কমানো হয়েছে। সরকার নির্ধারিত একটি সিঙ্গেল কেবিনের ভাড়া ১ হাজার ৭১৬ টাকা হলেও আমরা তা ১ হাজার ২০০ টাকায় দিচ্ছি। ডাবল কেবিন ও ডেক ভাড়াতেও ছাড় দেওয়া হচ্ছে।”
সদরঘাট টার্মিনালে দেখা যায়, পরিবার নিয়ে ভোলার উদ্দেশ্যে ‘এমভি টিপু-৬’ লঞ্চে উঠেছেন গুলিস্তানের বাসিন্দা বেসরকারি চাকরিজীবী মনোয়ার হোসেন। তিনি বলেন, “সড়কে যানজটের ভোগান্তি এড়াতে নৌপথই বেছে নিয়েছি। পরিবারের সঙ্গে স্বস্তিতে যাত্রা করতে পারছি।”
গত ঈদুল ফিতরে কয়েকটি দুর্ঘটনার অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বাড়তি কঠোরতা আরোপ করেছে বিআইডব্লিউটিএ। চলন্ত বা নোঙর করা লঞ্চে নৌকা কিংবা ট্রলার থেকে যাত্রী ওঠানামা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। নদীর মাঝপথে কোনো ট্রলার বা নৌকা লঞ্চের পাশে ভিড়তে পারবে না বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
এই নির্দেশনা বাস্তবায়নে নৌপুলিশ, কোস্টগার্ড, আনসার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সরব উপস্থিতি দেখা গেছে সদরঘাট এলাকায়। পন্টুনের আশপাশে নৌকা চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে এবং ১ থেকে ২৫ নম্বর পন্টুন পর্যন্ত চারটি বিশেষ টহল টিম মোতায়েন করা হয়েছে।
এ ছাড়া টার্মিনাল এলাকায় হকারমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত, ফ্রি কুলি সেবা চালু, ওয়াচ টাওয়ার থেকে সার্বক্ষণিক নজরদারি এবং কন্ট্রোল রুম চালুর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের আগেই যাত্রী পূর্ণ হলে লঞ্চ ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
ঈদযাত্রার অতিরিক্ত চাপ কমাতে রোববার থেকে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বছিলা লঞ্চঘাট এবং নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের পূর্বাচল কাঞ্চন ব্রিজ সংলগ্ন শিমুলিয়া ট্যুরিস্ট ঘাট থেকে বিশেষ লঞ্চ সার্ভিস চালু করা হয়েছে। এই বিশেষ সার্ভিস চলবে ঈদের আগের দিন পর্যন্ত।
বিআইডব্লিউটিএ জানিয়েছে, গত ঈদুল ফিতরে পরীক্ষামূলকভাবে চালু হওয়া এ দুটি ঘাটে যাত্রীদের ইতিবাচক সাড়া পাওয়ায় এবারও কার্যক্রম চালু রাখা হয়েছে। গতবার বছিলা ঘাট থেকে ছয়টি রুটে ছয়টি লঞ্চ চললেও এবার ১২টি লঞ্চ যুক্ত করা হয়েছে। শিমুলিয়া ঘাট থেকে আগের মতো দুটি লঞ্চ ও একটি ফেরি চলাচল করছে।
সরেজমিন বছিলা ঘাটে গিয়ে দেখা যায়, যাত্রীদের পাশাপাশি স্থানীয়দের মধ্যেও উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে। যদিও প্রথম দিনে যাত্রী চাপ তুলনামূলক কম ছিল, তবে আগামী কয়েকদিনে ভিড় বাড়বে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিআইডব্লিউটিএর শুল্ক আদায়কারী কর্মকর্তা ইনসানুর রহমান বলেন, “সদরঘাটের ওপর চাপ কমাতেই বছিলা ঘাট চালু করা হয়েছে। মোহাম্মদপুর, গাবতলী, ধানমন্ডি, আশুলিয়া ও সাভার এলাকার মানুষ এখন সহজেই এই ঘাট ব্যবহার করে নৌপথে গন্তব্যে যেতে পারবেন।”
বিআইডব্লিউটিএর ঢাকা নদীবন্দরের যুগ্ম পরিচালক মোবারক হোসেন জানান, “ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী সব অংশীজনের সঙ্গে সমন্বয় সভা করা হয়েছে। সদরঘাট থেকে পরিচালিত ৩৮টি রুটে ১৭৫টি লঞ্চের সময়সূচি নির্ধারণ করা হয়েছে। যাত্রীদের নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক যাত্রা নিশ্চিত করতে সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।”
ঈদ সামনে রেখে নৌপথে বাড়তে থাকা যাত্রীর চাপ, বাড়তি নিরাপত্তা, বিশেষ সার্ভিস এবং নতুন ঘাট চালুর কারণে এবার অনেকটাই স্বস্তির যাত্রা হবে বলে আশা করছেন ঘরমুখো মানুষ।
২৭/২, দূর্গাপুর, উপর রাজারামপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৬৩০০
২০২৫ © দৈনিক অধিকার কতৃক সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত