পবিত্র ঈদুল আজহা মুসলিম উম্মাহর অন্যতম বড় ধর্মীয় উৎসব। এই উৎসবের মূল প্রতিপাদ্য ত্যাগ, আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। প্রতি বছর ঈদের দিন সামর্থ্যবান মুসলমানরা গরু, ছাগল, মহিষসহ বিভিন্ন পশু কোরবানি দিয়ে থাকেন। কোরবানির পর পশুর মাংস ভাগ ও বণ্টন নিয়ে সমাজে দীর্ঘদিন ধরে নানা রীতি ও মতবাদ প্রচলিত রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত বিষয় হলো—কোরবানির মাংস তিন ভাগ করা।
ধর্মীয় আলোচনায় প্রায়ই বলা হয়, কোরবানির মাংসের এক ভাগ নিজের পরিবারের জন্য, এক ভাগ আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীদের জন্য এবং বাকি এক ভাগ গরিব-মিসকিনদের মধ্যে বণ্টন করা উত্তম। তবে ইসলামি চিন্তাবিদ ও আলেম সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, এই পদ্ধতি কোরআন ও হাদিস দ্বারা সমর্থিত হলেও এটি কোনোভাবেই বাধ্যতামূলক নয়।
ইসলামিক ফাউন্ডেশনের দায়িত্বশীল আলেমদের ভাষ্য অনুযায়ী, কোরবানির মাংস বণ্টনের ক্ষেত্রে ইসলামে নমনীয়তা রাখা হয়েছে। কেউ চাইলে পুরো মাংস নিজে রাখতে পারেন, আবার ইচ্ছা করলে সবটুকু গরিবদের মধ্যেও দান করে দিতে পারেন।
পবিত্র কোরআনের সূরা হজে কোরবানির মাংস সম্পর্কে বলা হয়েছে—“তোমরা তা থেকে খাও এবং অভাবগ্রস্ত ও দরিদ্রদের খাওয়াও।” ইসলামি গবেষকদের মতে, এই আয়াতের মাধ্যমে কোরবানির মাংস নিজেরা খাওয়ার পাশাপাশি অন্যদের মধ্যে বণ্টনের উৎসাহ দেওয়া হয়েছে।
হাদিস ও ইসলামি বর্ণনা অনুযায়ী, মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) কোরবানির মাংসের একটি অংশ নিজের পরিবারের জন্য রাখতেন, একটি অংশ আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীদের দিতেন এবং অপর অংশ দরিদ্র মানুষের মধ্যে বণ্টন করতেন। এ কারণেই মুসলিম সমাজে “তিন ভাগ” করার বিষয়টি ব্যাপকভাবে প্রচলিত হয়েছে।
তবে আলেমরা স্পষ্ট করে বলছেন, এটি মুস্তাহাব বা উত্তম আমল—ফরজ বা ওয়াজিব নয়। অর্থাৎ তিন ভাগ করাকে ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা হিসেবে চাপিয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই।
বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে কোরবানির সময় “সামাজিক ভাগ” নামে একটি বিশেষ রীতি বহুদিন ধরে প্রচলিত রয়েছে। অনেক এলাকায় কোরবানিদাতারা স্বেচ্ছায় মাংসের একটি অংশ সমাজের গরিব মানুষ, মসজিদ বা কল্যাণমূলক কাজে দান করেন।
তবে কোথাও কোথাও এই সামাজিক ভাগ বাধ্যতামূলকভাবে আদায় করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। ধর্মীয় গবেষকরা বলছেন, কোনো ব্যক্তি যদি স্বতঃস্ফূর্তভাবে মাংস দেন, তাহলে তা অবশ্যই প্রশংসনীয়। কিন্তু জোরপূর্বক নির্দিষ্ট পরিমাণ মাংস দিতে বাধ্য করা ইসলামের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য নয়।
ইসলামি লেখক ও গবেষকরা মনে করেন, কোরবানির অন্যতম সামাজিক উদ্দেশ্য হলো দরিদ্র মানুষদের আনন্দে শামিল করা। যে কারণে প্রতি ঈদেই অসংখ্য নিম্নআয়ের মানুষ বাড়ি বাড়ি গিয়ে মাংস সংগ্রহ করেন এবং অনেক পরিবার আগেভাগেই তাদের জন্য মাংস আলাদা করে রাখেন।
আলেম সমাজের মতে, কোরবানির মূল শিক্ষা কেবল পশু জবাই নয়; বরং আল্লাহর প্রতি আনুগত্য ও তাকওয়া অর্জন। কোরআনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, “আল্লাহর কাছে কোরবানির পশুর রক্ত বা গোশত পৌঁছায় না, পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া।”
এ কারণে ধর্মীয় পণ্ডিতরা বলছেন, কোরবানির মাংস তিন ভাগ করা একটি সুন্দর ও মানবিক চর্চা হলেও এটিকে কঠোর নিয়ম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা উচিত নয়। বরং সামর্থ্য, প্রয়োজন ও আন্তরিকতার ভিত্তিতে মাংস বণ্টন করাই ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আত্মীয়তা রক্ষা, প্রতিবেশীর খোঁজ নেওয়া এবং গরিব মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর মধ্য দিয়েই কোরবানির প্রকৃত সৌন্দর্য ফুটে ওঠে।
২৭/২, দূর্গাপুর, উপর রাজারামপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৬৩০০
২০২৫ © দৈনিক অধিকার কতৃক সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত