রাজধানীর মগবাজারে অবস্থিত আদ-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালকে ঘিরে নতুন করে বিতর্কের জন্ম হয়েছে। একদিকে ছয় নবজাতকের রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনায় দেশজুড়ে আলোচনার ঝড়, অন্যদিকে সেই ঘটনার সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে হাসপাতালের নিরাপত্তা ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের হামলার শিকার হয়েছেন একাধিক সাংবাদিক। একই দিনে হাসপাতালের ছাদে অবৈধভাবে পরিচালিত একটি বেকারির সন্ধান পেয়ে জরুরি পরিদর্শনে যান স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। পরিদর্শনে উঠে আসে নানা অনিয়ম, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও নিরাপত্তা ঝুঁকির অভিযোগ।
শনিবার (৩০ মে) সন্ধ্যায় ঘটে যাওয়া এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সাংবাদিক মহলে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। গণমাধ্যমকর্মীরা এ ঘটনাকে সংবাদপেশার স্বাধীনতার ওপর সরাসরি আঘাত হিসেবে উল্লেখ করে দায়ীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
জানা গেছে, গত বুধবার আদ-দ্বীন হাসপাতালে একসঙ্গে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় অনুসন্ধান এবং স্বাস্থ্য উপদেষ্টার পরিদর্শনের তথ্য সংগ্রহের জন্য বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিকরা হাসপাতালে যান। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের নির্দেশে সাংবাদিকদের প্রবেশে বাধা দেওয়া হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, হাসপাতালের সব প্রবেশপথ বন্ধ করে দেওয়া হয়। প্রধান ফটকসহ বিভিন্ন গেটে নিরাপত্তাকর্মী ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের লাঠিসোটা হাতে মোতায়েন করা হয়। এতে সাংবাদিকদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয় এবং একপর্যায়ে উভয় পক্ষের মধ্যে তীব্র বাকবিতণ্ডা শুরু হয়।
পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে মগবাজার থানা পুলিশ ও র্যাব সদস্যরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতির মধ্যেও কয়েকজন সাংবাদিককে ধাক্কাধাক্কি, হেনস্তা এবং শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়।
সাংবাদিকদের অভিযোগ, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পরিকল্পিতভাবে তথ্য গোপন এবং গণমাধ্যমকে ভয়ভীতি দেখানোর চেষ্টা করেছে।
ঘটনার পর হাসপাতালের এক সিনিয়র ম্যানেজার ঘটনাস্থলে এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন। তবে সাংবাদিকদের অভিযোগের জবাবে সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে না পারায় ক্ষোভ আরও বাড়ে।
উপস্থিত সাংবাদিকরা বলেন, জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে হামলার শিকার হওয়া অত্যন্ত উদ্বেগজনক। একটি হাসপাতাল প্রশাসনের এমন আচরণ প্রশ্নবিদ্ধ এবং অগ্রহণযোগ্য।
এদিকে একই দিন হাসপাতাল পরিদর্শনে এসে স্বাস্থ্য উপদেষ্টা সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন হাসপাতালের ছাদে পরিচালিত একটি বেকারির সন্ধান পান। পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, বেকারিটি সম্পূর্ণ অনিয়ম ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে পরিচালিত হচ্ছিল।
তিনি জানান, সেখানে মাত্র দুটি বৈদ্যুতিক ওভেন দিয়ে খাবার প্রস্তুত করা হতো এবং পুরো পরিবেশ ছিল অত্যন্ত নোংরা ও ঝুঁকিপূর্ণ। কোনো প্রকৌশলীর তদারকি ছাড়াই কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছিল বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে।
স্বাস্থ্য উপদেষ্টা বলেন, “হাজার হাজার শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জন্য প্রতিদিন এখান থেকে খাবার প্রস্তুত করা হতো। সেখানে প্রচুর ময়লা-আবর্জনা পাওয়া গেছে। কোনো বিষাক্ত গ্যাস নির্গত হয়েছে কি না, সেটিও তদন্ত করে দেখা হবে।”
তিনি আরও বলেন, “জনস্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার প্রশ্নে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
গত বুধবার আদ-দ্বীন হাসপাতালে স্বল্প সময়ের ব্যবধানে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনা ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। মৃত্যুর কারণ নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তদন্ত কমিটি ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছে। হাসপাতালের পোস্ট-অপারেটিভ ওয়ার্ডে নির্মাণগত ত্রুটি ও পরিবেশগত সমস্যার বিষয়েও প্রাথমিকভাবে কিছু তথ্য সামনে এসেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হাসপাতালের ভেতরে অবৈধ ও অস্বাস্থ্যকর বেকারির অস্তিত্ব এবং একই সময়ে নবজাতক মৃত্যুর ঘটনা গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন। যদিও এখনো দুই ঘটনার মধ্যে কোনো সরাসরি সম্পর্ক পাওয়া যায়নি, তবুও সম্ভাব্য সব দিক খতিয়ে দেখার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠন নিন্দা ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তারা বলছে, জনস্বার্থে তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের বাধা দেওয়া এবং হামলা চালানো গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পরিপন্থী।
তাদের দাবি, হামলার সঙ্গে জড়িত নিরাপত্তাকর্মী ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দ্রুত চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে এবং হাসপাতালে ঘটে যাওয়া অনিয়ম ও নবজাতক মৃত্যুর ঘটনা স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে।
ছয় নবজাতকের মৃত্যুর রহস্য, হাসপাতালের অভ্যন্তরীণ অনিয়ম এবং সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে আদ-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এখন জনমনে নানা প্রশ্নের মুখে। তদন্তের ফলাফল কী আসে, সেদিকেই তাকিয়ে আছে দেশবাসী।
২৭/২, দূর্গাপুর, উপর রাজারামপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৬৩০০
২০২৫ © দৈনিক অধিকার কতৃক সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত