ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ে এশার নামাজের সময় মেলার উচ্চ শব্দের মাইক সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার অনুরোধ করায় এক মসজিদের ইমামের ওপর নৃশংস হামলার ঘটনা ঘটেছে। হামলাকারীদের লোহার রড ও লাঠির আঘাতে গুরুতর আহত হয়েছেন সরদারবাড়ি জামে মসজিদের ইমাম মাওলানা ইউসুফ হোসেন। হামলায় তার বাঁ চোখ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন।
শুক্রবার (২৯ মে) রাতে উপজেলার যশরা ইউনিয়নের বখুরা সরদারবাড়ি এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। ঘটনার পর থেকেই এলাকায় ব্যাপক উত্তেজনা বিরাজ করছে। এ হামলার প্রতিবাদে শনিবার সকালে গফরগাঁও পৌর শহরের জামতলা মোড়ে বিশাল বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এতে স্থানীয় আলেম-ওলামা, ধর্মপ্রাণ মুসল্লি এবং বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের নেতারা অংশ নেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, আসন্ন ঈদুল আজহা উপলক্ষে বখুরা সরদারবাড়ি এলাকায় একটি মেলার আয়োজন করা হয়। মেলার অবস্থান ছিল মসজিদের একেবারে পাশেই। শুক্রবার রাতে এশার নামাজের সময় মেলায় উচ্চস্বরে গান ও প্রচারণা চলতে থাকে। এতে মসজিদের ভেতরে নামাজ আদায়ে ব্যাঘাত সৃষ্টি হয় এবং মুসল্লিরা বিরক্তি প্রকাশ করেন।
এ অবস্থায় মসজিদের ইমাম মাওলানা ইউসুফ হোসেন মেলার আয়োজকদের কাছে গিয়ে নামাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত মাইকটি কিছু সময়ের জন্য বন্ধ রাখার অনুরোধ জানান।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ইমামের এই অনুরোধে মেলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন যুবক ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। কথাকাটাকাটির একপর্যায়ে তারা সংঘবদ্ধভাবে ইমামের ওপর হামলা চালান।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, হামলাকারীরা লোহার রড, লাঠিসোঁটা ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে ইমামকে বেধড়ক মারধর করে। হামলার সময় তিনি মাটিতে পড়ে গেলেও রেহাই পাননি। তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর আঘাত লাগে এবং বাঁ চোখে মারাত্মক জখম হয়।
পরে স্থানীয় লোকজন ও মুসল্লিরা তাকে উদ্ধার করে প্রথমে গফরগাঁও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাকে দ্রুত ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।
চিকিৎসা সূত্রে জানা গেছে, তার চোখের আঘাত অত্যন্ত গুরুতর। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে তার চিকিৎসা চলছে।
ইমামের ওপর হামলার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর শনিবার সকাল থেকেই গফরগাঁওয়ে ক্ষোভের সঞ্চার হয়। বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের আলেম-ওলামারা প্রতিবাদে একত্রিত হন।
পরে জামতলা মোড় থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়। মিছিলটি শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে প্রতিবাদ সমাবেশে মিলিত হয়।
সমাবেশে বক্তারা বলেন, একজন ইমাম নামাজের সময় মাইক বন্ধ রাখার অনুরোধ করবেন—এটাই স্বাভাবিক ও দায়িত্বশীল আচরণ। কিন্তু সেই অনুরোধের জবাবে তাকে রক্তাক্ত করা হয়েছে, যা শুধু একজন ব্যক্তির ওপর হামলা নয়, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও সামাজিক শৃঙ্খলার ওপরও আঘাত।
প্রতিবাদ সমাবেশে বাংলাদেশ মানবাধিকার ও সাংবাদিক সংস্থার চেয়ারম্যান একরাম উল্লাহ বলেন, “একজন ধর্মীয় নেতার ওপর এমন হামলা সভ্য সমাজে কল্পনাতীত। দোষীদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।”
খায়রুল উম্মাহ ফাউন্ডেশনের সাংগঠনিক সম্পাদক মুফতি জহিরুল ইসলাম উসমানী বলেন, “নামাজের সময় মাইক বন্ধ রাখার অনুরোধ করা কোনো অপরাধ নয়। বরং ধর্মীয় সহনশীলতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধের পরিচয়। হামলাকারীরা আইন ও নৈতিকতার সব সীমা লঙ্ঘন করেছে।”
এ সময় বক্তব্য দেন ময়মনসিংহ জেলা দক্ষিণ বিএনপির সদস্য ফজলুল হক, মাদকবিরোধী ইসলামী সাংস্কৃতিক ফোরামের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মাওলানা ইউসুফ বিন মনির এবং ইত্তেফাকুল উলামা গফরগাঁও শাখার সাধারণ সম্পাদক মাওলানা হুমায়ুন কবিরসহ স্থানীয় আলেম-ওলামারা।
ঘটনার পর ভুক্তভোগী পক্ষের অভিযোগের ভিত্তিতে গফরগাঁও থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে।
গফরগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আ স ম আতিকুর রহমান বলেন, “হামলার ঘটনায় মামলা হয়েছে। অভিযুক্তরা বর্তমানে পলাতক রয়েছে। তাদের গ্রেপ্তারে পুলিশের একাধিক টিম কাজ করছে। খুব দ্রুতই জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হবে।”
স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, ধর্মীয় উপাসনার সময় শব্দদূষণ বন্ধ রাখা এবং পারস্পরিক সহনশীলতা বজায় রাখা সামাজিক দায়িত্বের অংশ। সেখানে একজন ইমামের শান্তিপূর্ণ অনুরোধের জবাবে সহিংস হামলার ঘটনা উদ্বেগজনক।
তাদের মতে, এ ঘটনায় দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা না হলে সমাজে ভুল বার্তা যাবে এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় নেতাদের নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হবে।
গফরগাঁওয়ের এই ঘটনা ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এখন সবার নজর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পদক্ষেপ এবং হামলাকারীদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়, সেদিকে।
২৭/২, দূর্গাপুর, উপর রাজারামপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৬৩০০
২০২৫ © দৈনিক অধিকার কতৃক সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত