দেশের বিভিন্ন সীমান্তে সাম্প্রতিক সময়ে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের কথিত ‘পুশইন’ প্রচেষ্টাকে প্রতিহত করতে কঠোর অবস্থান নিয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। লালমনিরহাট, পঞ্চগড়, নওগাঁ ও যশোরের বিভিন্ন সীমান্তে একাধিক ঘটনায় বিজিবির সক্রিয় ভূমিকা এবং স্থানীয় জনগণের সহযোগিতায় এসব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
সীমান্ত এলাকায় দায়িত্বশীল সূত্রগুলোর দাবি, অতীতে যেসব ঘটনায় বাংলাদেশ সীমান্তে অনুপ্রবেশ বা পুশইনের অভিযোগ উঠেছিল, বর্তমানে সেসব বিষয়ে বিজিবি আরও সতর্ক ও দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করেছে। আন্তর্জাতিক আইন ও প্রচলিত সীমান্ত প্রটোকল অনুসরণ করে পরিচয় যাচাই ছাড়া কাউকে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না বলে বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার সাপ্পারবাড়ি সীমান্তে শনিবার দুপুরে একজন ভারতীয় নাগরিককে বাংলাদেশে প্রবেশ করানোর চেষ্টা করা হয় বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিজিবির কালিরহাট বিওপি সূত্রে জানা যায়, দুপুরের দিকে সীমান্তের জিরো লাইনের কাছে ওই ব্যক্তিকে নিয়ে আসা হলে বিজিবি টহল দল আপত্তি জানায়। পরে বিএসএফ সদস্যরা তাকে নিয়ে ভারতের অভ্যন্তরে ফিরে যায়।
বিজিবি কর্মকর্তারা জানান, সীমান্ত আইন ও পরিচয় যাচাইয়ের প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে কাউকে বাংলাদেশে প্রবেশের সুযোগ নেই।
পঞ্চগড় সদর উপজেলার বড়বাড়ি সীমান্তে নারী, শিশু ও পুরুষসহ ১০ জনকে ঘিরে প্রায় ৩০ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। শুক্রবার ভোর থেকে তারা সীমান্তের শূন্যরেখা এলাকায় অবস্থান করছিলেন বলে জানা গেছে।
বিজিবি সূত্রে জানা যায়, বিষয়টি নিয়ে একাধিকবার পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও তাৎক্ষণিক কোনো সমাধান পাওয়া যায়নি। মানবিক কারণে আটকে পড়া ব্যক্তিদের জন্য শুকনো খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
নওগাঁর সাপাহার সীমান্তে ১৭ জন নারী, পুরুষ ও শিশুকে বাংলাদেশে প্রবেশ করানোর চেষ্টা করা হয়েছিল বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি। তবে বিজিবির কঠোর অবস্থানের কারণে তারা দীর্ঘ সময় সীমান্তের শূন্যরেখায় অবস্থান করার পর শেষ পর্যন্ত বিএসএফ তাদের ফিরিয়ে নিয়ে যায় বলে জানা গেছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, রাতের আঁধারে তাদের ভারতীয় ভূখণ্ডে ফিরিয়ে নেওয়া হয়। এ ঘটনায় সীমান্ত এলাকায় সতর্কতা বাড়ানো হয়েছে।
যশোরের বেনাপোল সীমান্তেও একই ধরনের ঘটনার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়, কয়েকজন ভারতীয় নাগরিককে বাংলাদেশে প্রবেশ করানোর চেষ্টা করা হলে বিজিবি এবং স্থানীয় বাসিন্দারা সতর্ক অবস্থান নেন। পরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয় এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভারতীয় অংশে ফিরিয়ে নেওয়া হয়।
বিজিবির ৪৯ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে জোরপূর্বক কাউকে বাংলাদেশে পাঠানোর কোনো সুযোগ নেই। পরিচয় ও নাগরিকত্ব যাচাই ছাড়া কাউকে গ্রহণ করা হবে না।
বিজিবি জানিয়েছে, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর পর সীমান্তের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে টহল ও নজরদারি আরও জোরদার করা হয়েছে। যেকোনো ধরনের অনুপ্রবেশ বা পুশইনের চেষ্টা প্রতিহত করতে সদস্যরা সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন।
পাটগ্রাম সীমান্তে দায়িত্ব পালনকারী এক কর্মকর্তা জানান, সীমান্তে কোনো ধরনের অস্বাভাবিক তৎপরতা দেখা গেলে তাৎক্ষণিকভাবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং প্রতিবাদ জানানো হচ্ছে।
পঞ্চগড় সীমান্তে আটকে পড়া নারী, শিশু ও পুরুষদের মানবিক পরিস্থিতিও আলোচনায় এসেছে। দীর্ঘ সময় খোলা আকাশের নিচে অবস্থান করায় তারা দুর্ভোগের মুখে পড়েছেন বলে জানা গেছে। তবে সীমান্তে অবস্থানরত বাহিনীগুলো পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো নিয়ে বিভিন্ন সীমান্তে বিজিবি ও বিএসএফের মধ্যে একাধিক পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও এখন পর্যন্ত কোনো স্থায়ী সমাধানের খবর পাওয়া যায়নি। বিজিবি বলছে, আন্তর্জাতিক নিয়মনীতি ও দ্বিপক্ষীয় চুক্তির আলোকে বিষয়গুলোর সমাধান হওয়া উচিত।
সীমান্ত বিশ্লেষকদের মতে, একাধিক সীমান্তে একই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি দুই দেশের সীমান্ত ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে আলোচনার প্রয়োজনীয়তা সামনে নিয়ে এসেছে। তবে বিজিবি বলছে, দেশের সার্বভৌমত্ব ও সীমান্ত নিরাপত্তা রক্ষায় তারা সর্বোচ্চ সতর্ক এবং যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত।
২৭/২, দূর্গাপুর, উপর রাজারামপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৬৩০০
২০২৫ © দৈনিক অধিকার কতৃক সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত