জীবিকার তাগিদে শত মাইল দূর থেকে এসেছিলেন দু’জন তরুণ শ্রমিক। পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর স্বপ্ন নিয়ে প্রতিদিনের মতো উঠেছিলেন নির্মাণাধীন বহুতল ভবনের উঁচু তলায়। কিন্তু মুহূর্তের এক অসতর্কতা কিংবা নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতি তাদের জীবনের শেষ অধ্যায়ে পরিণত হলো। ময়মনসিংহ নগরীর কলেজ রোড এলাকায় নির্মাণাধীন একটি ১০ তলা ভবনের অষ্টম তলা থেকে পড়ে মর্মান্তিকভাবে প্রাণ হারিয়েছেন দুই নির্মাণশ্রমিক।
বুধবার (১৭ জুন) বিকেলে ঘটে যাওয়া এই হৃদয়বিদারক দুর্ঘটনায় নিহত হন ঝিনাইদহ জেলার বাসিন্দা মো. মাসুদ মিয়া (৩০) এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার বাসিন্দা সিয়াম মিয়া (২৪)। তাদের মৃত্যুতে স্বজনদের মধ্যে নেমে এসেছে শোকের ছায়া, আর নতুন করে সামনে এসেছে নির্মাণ খাতে শ্রমিক নিরাপত্তার করুণ বাস্তবতা।
স্থানীয় ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, কলেজ রোডের নির্মাণাধীন এনায়েত হোসেন চৌধুরী টাওয়ারের অষ্টম তলায় কাজ করছিলেন ওই দুই শ্রমিক। কাজ করার একপর্যায়ে হঠাৎ তারা নিচে পড়ে গুরুতর আহত হন। সহকর্মী ও স্থানীয়রা দ্রুত উদ্ধার করে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাদের মৃত ঘোষণা করেন।
জানা গেছে, জীবিকার সন্ধানে নিজ জেলা ছেড়ে ময়মনসিংহে এসে নির্মাণশ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন মাসুদ ও সিয়াম। প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়েই বহুতল ভবনের উঁচু স্থানে কাজ করতেন তারা। কিন্তু সেই কর্মস্থলই শেষ পর্যন্ত হয়ে উঠল তাদের মৃত্যুফাঁদ।
প্রত্যক্ষদর্শী ও সচেতন মহলের দাবি, বহুতল ভবনের নির্মাণকাজে নিরাপত্তা বেল্ট, সেফটি নেট, হেলমেট ও অন্যান্য সুরক্ষা সরঞ্জাম নিশ্চিত করা হলে এ ধরনের অনেক দুর্ঘটনা প্রতিরোধ করা সম্ভব। শ্রমিকের জীবন কোনোভাবেই নির্মাণ ব্যয়ের হিসাবের বাইরে থাকতে পারে না। নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু আইনের বাধ্যবাধকতা নয়, এটি মানবিক দায়িত্বও।
ভবনটির মালিক নেত্রকোনা মেডিকেল কলেজের প্রভাষক রফিকুল ইসলাম। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ভবনটির নির্মাণকাজ পরিচালিত হচ্ছিল বলে জানা গেছে। তবে দুর্ঘটনার সময় পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল কি না, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত ও জবাবদিহির দাবি উঠেছে।
ময়মনসিংহ কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ শিবিরুল ইসলাম জানান, নিহত দুই শ্রমিকের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে রাখা হয়েছে। পরিবারের সদস্যরা এলে প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে মরদেহ হস্তান্তর করা হবে।
এই দুর্ঘটনা কেবল দুই শ্রমিকের প্রাণহানির ঘটনা নয়; এটি নির্মাণ শিল্পে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা নিরাপত্তা অবহেলার এক নির্মম প্রতিচ্ছবি। প্রতিদিন অসংখ্য শ্রমিক জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আকাশছোঁয়া ভবন নির্মাণ করেন, অথচ অনেক ক্ষেত্রেই তাদের জন্য নিশ্চিত করা হয় না ন্যূনতম নিরাপত্তা ব্যবস্থা।
সংশ্লিষ্টদের মতে, নির্মাণ খাতে নিয়মিত তদারকি, কঠোর নিরাপত্তা নীতিমালা বাস্তবায়ন এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি নিশ্চিত করা না গেলে এমন স্বপ্নভাঙা মৃত্যুর মিছিল থামবে না।
২৭/২, দূর্গাপুর, উপর রাজারামপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৬৩০০
২০২৫ © দৈনিক অধিকার কতৃক সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত