দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর দলীয় নেতার জামিনে মুক্তির আনন্দ ভাগাভাগি করতে ছুটে এসেছিলেন তিনি। হাতে ছিল শুভেচ্ছা, মনে ছিল প্রিয় নেতাকে ফুল দিয়ে বরণ করার উচ্ছ্বাস। কিন্তু সেই আনন্দের মুহূর্তই পরিণত হলো এক পরিবারের জন্য আজীবনের বেদনায়। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা কারা ফটকের সামনে অতিরিক্ত জনসমাগম ও অসুস্থ হয়ে পড়ার ঘটনায় প্রাণ হারালেন বিএনপি কর্মী ও গোমস্তাপুর সলেমান মিয়া ডিগ্রী কলেজের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী মো. মোবাশ্বর হোসেন মিঠু।
বুধবার (১৭ জুন) বিকেলে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা কারাগারের সামনে এ হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটে। নিহত মিঠু গোমস্তাপুর উপজেলার বাজারপাড়া কাঁশিপুর গ্রামের মৃত মাহাতাব উদ্দিনের ছেলে। তিনি গোমস্তাপুর সোলেমান মিঞা কলেজের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী হিসেবেও কর্মরত ছিলেন।
জানাগেছে,গত ২৬ এপ্রিল গোমস্তাপুর উপজেলার খয়রাবাদ এলাকায় অবস্থিত ‘রায়হান ফিলিং স্টেশন’-এ একটি মেরামতাধীন গাড়ির জন্য ইঞ্জিন অয়েল নিতে যান নাচোল থানার কনস্টেবল শওকত হোসেন। এ সময় ফিলিং স্টেশনে উপস্থিত মালিক আব্দুল্লাহ আল রায়হানের সঙ্গে কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে কনস্টেবলকে মারধরের ঘটনা ঘটেে এবং কনেস্টবল শওকত আলী গুরত্বর আহত হয়।
এ ঘটনায় আহত পুলিশ সদস্য শওকত হোসেন বাদী হয়ে গোমস্তাপুর থানায় প্রধান আসামী আব্দুল্লাহ আল রায়হানসহ ৬ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাত নামা ৫-৬ কে আসামী করে একটি মামলা দায়ের করেন। গোমস্তাপুর থানার মামলা নং-২৬, তারিখ-২৬/০৪/২০২৬ইং। মামলা দায়েরের পর থেকেই আত্মগোপনে চলে যায় রায়হান।
৮ মে সন্ধ্যা আনুমানিক সাড়ে ৭টার দিকে ঢাকা রাজধানীর উত্তরা পশ্চিম থানার ৫ নম্বর সেক্টর এলাকা থেকে র্যাব-১ এর সহযোগিতায় আত্মগোপনে থাকা রায়হানকে গ্রেপ্তার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। মে মাসের ৯ তারিখ দুপুরে চাঁপাইনবাবগঞ্জের সংশ্লিষ্ঠ আদালতে তোলা হলে বিজ্ঞ আদালতের বিচারক রায়হান কে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।
পরবর্তীতে তিনি মহামান্য হাই কোর্ট বিভাগে ৩৬৪৪২/২০২৬ ফৌজদারী মিস মামলা এবং ৪২৭৩৪/২৬ নং টেন্ডার মামলায় জামিনের আবেদন করেন । রায়হানের আবেদনের প্রেক্ষিতে ১৫ই জুন/২০২৬ শুনানী অন্তে মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগ আব্দুল্লাহ আল রায়হান কে জামিনে মুক্তির আদেশ দেন। বুধবার তার মুক্তির খবর এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে।
বিকেল থেকেই মোটরসাইকেল, সিএনজি ও বিভিন্ন যানবাহনে করে শত শত নেতাকর্মী ও সমর্থক চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা কারাগারের সামনে জড়ো হতে থাকেন। কারাগারের প্রধান ফটক এলাকায় সৃষ্টি হয় উপচে পড়া ভিড়। মুক্তি পাওয়ার পর ফুলের মালা দিয়ে আব্দুল্লাহ আল রায়হানকে বরণ করেন নেতাকর্মীরা এবং আনন্দ-উল্লাস প্রকাশ করেন।
ঠিক সেই মুহূর্তেই ঘটে অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা। প্রচণ্ড ভিড় ও শারীরিক অসুস্থতার কারণে হঠাৎ মাটিতে লুটিয়ে পড়েন মোবাশ্বর হোসেন মিঠু। উপস্থিত নেতাকর্মীরা দ্রুত তাকে উদ্ধার করে ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা হাসপাতালে নিয়ে যান। তবে শেষ রক্ষা হয়নি। কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. ইশারুল ইসলাম তুষার জানান, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তার মৃত্যু হয়েছে। তবে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত করা হবে।
এ বিষয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. একরামুল হোসাইন বলেন, “নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো অভিযোগ বা মামলা করা হলে বিষয়টি তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
মিঠুর আকস্মিক মৃত্যুতে তার পরিবার, সহকর্মী ও স্থানীয়দের মাঝে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। যে মানুষটি নেতার মুক্তির আনন্দ ভাগ করে নিতে গিয়েছিলেন, সেই মানুষকেই কিছুক্ষণের মধ্যে নিথর দেহ হয়ে ফিরতে হয় পরিবারের কাছে-এমন ঘটনা এলাকায় গভীর আলোচনার জন্ম দিয়েছে। নিহত মো. মোবাশ্বর হোসেন মিঠু দুই কন্যা সন্তানের জনক।
কারাগারের সামনে এমন বিশাল জমায়েত নিয়ে প্রশ্ন
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো ব্যক্তি জামিনে মুক্তি পেলে স্বজন ও পরিচিতজন কারাগারে উপস্থিত হয়ে তাকে গ্রহণ করতে পারেন। তবে জনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত হয়, যান চলাচলে বাধা সৃষ্টি হয় কিংবা নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করে-এমন বড় আকারের সমাবেশ বা মিছিলের ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, আদালতের দেওয়া জামিন একটি আইনি প্রক্রিয়া। এটিকে কেন্দ্র করে অতিরিক্ত জনসমাগম, উচ্ছ্বাস কিংবা নিয়ন্ত্রণহীন ভিড় অনেক সময় অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়ে তোলে। তাই রাজনৈতিক কিংবা সামাজিক যেকোনো আয়োজনেই জননিরাপত্তা, শৃঙ্খলা ও স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
জেলা কারাগারে বন্দী থাকা আসামী আব্দুল্লাহ আল রায়হানের জামিনে মুক্তির খবর শুনে কারা ফটোকের প্রধান গেইটের সামনে হাজারো লোকের জমায়েত এবং শ্লোগান দেওয়া বিষয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা কারাগারের জেল সুপার মোঃ আমজাদ হোসেনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন,
"কারাগার একটি সংবেদনশীল (Sensitive) এলাকা। এখানে কোনো ধরনের গণজমায়েত, হট্টগোল বা উল্লাস করার সুযোগ নেই। বাংলাদেশের কারাগার ব্রিটিশ আমলের কারা আইন অনুযায়ী পরিচালিত হয়।"
আর দেশ চলে বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী। ১৭ ই জুন/২০২৬ রোজ বুধবার চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা কারা ফটোকের সামনে সংরক্ষিত এলাকায় গোমস্তাপুর উপজেলার আব্দুল্লাহ আল রায়হান নামে এক বন্দীর জামিনে মুক্তি কে ঘিরে তার সমর্থকরা মোটরসাইকেল, সিএনজি ও বিভিন্ন যানবাহনে করে শত শত নেতাকর্মী ও সমর্থক চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা কারাগারের সামনে জড়ো হতে থাকেন। এবং কারাগারের প্রধান ফটক এলাকায় সৃষ্টি হয় উপচে পড়া ভিড়। জেল সুপার আরো বলেন, আব্দুল্লাহ আল রায়হান নামের এক বন্দীর জামিনে মুক্তি কে কেন্দ্র করে কারা ফটোকের সামনে আইন অমান্য করে "১৭ জুন আব্দুল্লাহ আল রায়হানের জামিনে মুক্তিকে কেন্দ্র করে হাজারো মানুষ কারা ফটকের সামনে জড়ো হয়ে স্লোগান ও উল্লাস করেছে। এটি আইনবিরোধী। সেই ভিড়ের মধ্যেই একজন ব্যক্তি হার্ট অ্যাটাকে মারা গেছেন বলে শুনেছি। এ ধরনের জমায়েত মোটেও সমর্থনযোগ্য নয়।" এটি সম্পূর্ণ আইন বিরোধী বলেও জানান, জেল সুপার মোঃ আমজাদ হোসেন।
একজন ব্যাক্তির মৃত্যু শুধু একটি সংখ্যা নয়; এটি একটি পরিবারের স্বপ্ন, দায়িত্ব ও নির্ভরতার হঠাৎ অবসান। মিঠুর মৃত্যু তাই কারাগারের সামনে এক দিনের রাজনৈতিক উচ্ছ্বাসকে রূপ দিয়েছে এক শোকাবহ স্মৃতিতে।
২৭/২, দূর্গাপুর, উপর রাজারামপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৬৩০০
২০২৫ © দৈনিক অধিকার কতৃক সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত