রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার দেওপাড়া ইউনিয়নের ঈশ্বরীপুর গ্রাম যেন এখন মানুষের নয়, মাছির রাজত্ব। একটি লেয়ার মুরগির খামারের অব্যবস্থাপনায় সৃষ্ট অসহনীয় দুর্গন্ধ ও ভয়াবহ মাছির উপদ্রবে প্রায় ১২০টি পরিবারের ৬৪২ জন মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। এমনকি মাছির উৎপাত ও দুর্গন্ধের কারণে আত্মীয়স্বজনও আর বাড়িতে আসতে চান না। অনেকের অভিযোগ, মেয়ে-জামাই পর্যন্ত শ্বশুরবাড়িতে আসা বন্ধ করে দিয়েছেন।
গ্রামবাসীর দীর্ঘদিনের অভিযোগের পর উপজেলা প্রশাসনের তদন্তে অভিযোগের সত্যতা মিলেছে। তদন্ত প্রতিবেদনে পরিবেশ দূষণ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকির বিষয়টি উল্লেখ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে প্রতিবেদনটি পরিবেশ অধিদপ্তরের রাজশাহী কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। অধিদপ্তরও জানিয়েছে, পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ও বিধিমালা লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেছে এবং চলতি সপ্তাহেই খামার মালিকের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সরেজমিনে দেখা যায়, খামারের ভেতরে কয়েক সপ্তাহ ধরে মুরগির বিষ্ঠা জমে রয়েছে। প্রয়োজনীয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা না থাকায় খামার থেকে নির্গত হচ্ছে তীব্র দুর্গন্ধ। চারপাশে উড়ছে অসংখ্য মাছি। আশপাশের বাড়িঘরে খাবার ঢেকে রাখলেও মুহূর্তেই মাছি ভিড় করছে। রান্নাঘর, শোবার ঘর, এমনকি নবজাতকের বিছানাও মাছির হাত থেকে রক্ষা পাচ্ছে না।
স্থানীয়দের অভিযোগ, খামারে নিয়মিত দুর্গন্ধনাশক বা পরিবেশবান্ধব রাসায়নিক ব্যবহার না করায় পরিস্থিতি দিন দিন ভয়াবহ হয়ে উঠছে। গত তিন মাসে মাছির উপদ্রব এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, অনেক পরিবার স্বাভাবিকভাবে খাওয়া-দাওয়া পর্যন্ত করতে পারছে না।
গ্রামের বাসিন্দা রোহেনা বেগম বলেন,"তরকারি রান্না করে রাখতে পারি না। খাবার পরিবেশন করলেই ভাতের প্লেট ও তরকারিতে মাছি এসে পড়ে। পরিবারের সদস্যদের ঠিকমতো খাবার দিতে পারছি না। মাছির কারণে জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে।"
তিনি জানান, আগে খামারে সোনালি জাতের মুরগি পালন করা হতো। তখন কিছুটা দুর্গন্ধ থাকলেও এখনকার মতো ভয়াবহ মাছির উপদ্রব ছিল না। দ্রুত ব্যবস্থা না নেওয়া হলে আদালতের দ্বারস্থ হওয়ারও হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
[caption id="attachment_11937" align="alignnone" width="718"]
খামার থেকে ছড়ানো তীব্র দুর্গন্ধ এবং মাছির অবিরাম উপদ্রবে এলাকার মানুষ এখন স্বাভাবিকভাবে খাওয়া-দাওয়া করতেও পারছেন না।[/caption]
কয়েকদিন আগে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সন্তানের জন্ম দেওয়া লিপি খাতুন বলেন, "শিশুর শরীর ও মুখে সারাক্ষণ মাছি বসে থাকে। বাধ্য হয়ে সবসময় মশারি টাঙিয়ে রাখতে হচ্ছে। ঘরে কোনো খাবার রাখলেই মাছি এসে ঘিরে ধরে। নবজাতককে নিয়ে খুবই আতঙ্কে আছি।"
স্থানীয়দের আশঙ্কা, এভাবে চলতে থাকলে ডায়রিয়া, টাইফয়েড, আমাশয়, চর্মরোগসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়তে পারে।
গ্রামের বাসিন্দা মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন,"মাছির অত্যাচারে গত ছয় মাস ধরে আত্মীয়স্বজন বাড়িতে আসতে চান না। জামাইকে খেতে দিলে খাবারের ওপর মাছি বসে। ঘেন্না ও অস্বস্তির কারণে এখন সেও আর শ্বশুরবাড়িতে আসে না।"
তিনি জানান, অনেক সময় খাবারের সঙ্গে মাছি মুখে চলে যাচ্ছে। এতে শিশু ও বৃদ্ধদের স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বেড়েছে।
গ্রামবাসীর লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর ও ভূমি কার্যালয়ের প্রতিনিধিরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। গোদাগাড়ী উপজেলা প্রশাসনের তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়-খামারে জমে থাকা মুরগির বর্জ্য থেকে তীব্র দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পুরো গ্রাম পরিবেশ দূষণের শিকার হচ্ছে। জনসাধারণের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। গবাদিপশুকেও স্বাভাবিকভাবে খাবার খাওয়ানো কঠিন হয়ে পড়েছে। খামারে প্রয়োজনীয় দুর্গন্ধনাশক ব্যবহার করা হচ্ছে না। পরিবেশ রক্ষায় সরকার অনুমোদিত রাসায়নিক ব্যবহারের বিষয়টি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন। স্থানীয় জনজীবনে বিরূপ প্রভাব যাচাই করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। তদন্ত শেষে প্রতিবেদনটি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য পরিবেশ অধিদপ্তরের রাজশাহী কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে।
[caption id="attachment_11938" align="alignnone" width="729"]
রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার দেওপাড়া ইউনিয়নের ঈশ্বরীপুর গ্রামে একটি লেয়ার মুরগির খামার।[/caption]
পরিবেশ অধিদপ্তরের রাজশাহী কার্যালয়ের উপপরিচালক মোছা. তাছমিনা খাতুন বলেন,"গোদাগাড়ী উপজেলা প্রশাসনের তদন্ত প্রতিবেদন পেয়েছি। খামারের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, দুর্গন্ধ নিয়ন্ত্রণ এবং পরিবেশগত অনুমোদনের বিষয়গুলো যাচাই করা হয়েছে। সেখানে পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ও বিধিমালা লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেছে। চলতি সপ্তাহের মধ্যেই খামার মালিকের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"
অভিযোগের বিষয়ে খামারটির মালিক স্বপনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
গ্রামবাসীর দাবি, অবিলম্বে খামারের জমে থাকা বর্জ্য অপসারণ, আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত, দুর্গন্ধ ও মাছি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা এবং নিয়মিত সরকারি তদারকি করতে হবে। অন্যথায় ঈশ্বরীপুর গ্রাম বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য সংকটে পড়তে পারে।
স্থানীয়দের ভাষায়, "একটি খামারের অব্যবস্থাপনার দায় কেন পুরো গ্রামের মানুষ বহন করবে?" এখন সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে ঈশ্বরীপুরের শত শত পরিবার। প্রশাসনের ঘোষিত আইনগত পদক্ষেপ বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়, সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
২৭/২, দূর্গাপুর, উপর রাজারামপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৬৩০০
২০২৫ © দৈনিক অধিকার কতৃক সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত