লক্ষ্মীপুরের রায়পুর পৌরসভার গোডাউন রোডে ঘটে যাওয়া এক নৃশংস হত্যাকাণ্ডে মুহূর্তেই রক্তে রঞ্জিত হয়েছে একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ। মা ও তিন মেয়ের ওপর ধারালো অস্ত্র নিয়ে হামলার ঘটনায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে পাঁচজনে। প্রথমে ঘটনাস্থলে প্রাণ হারান মা শাহিনুর বেগম (৩৮) এবং তাঁর দুই মেয়ে ইকরা আক্তার (১৭) ও শিফা আক্তার (১৩)। গুরুতর আহত বড় মেয়ে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সায়মা আক্তার (২১) চিকিৎসাধীন অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যান। অন্যদিকে, স্থানীয়দের গণপিটুনিতে আহত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন অভিযুক্ত অন্তর মজুমদার। ভয়াবহ এ ঘটনায় পুরো রায়পুরে নেমে এসেছে শোক, ক্ষোভ ও আতঙ্কের ছায়া।
বৃহস্পতিবার সকালে রায়পুর পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের গোডাউন রোড এলাকার একটি ভাড়া বাসায় এ মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। দিনের আলোয় জনবহুল এলাকায় সংঘটিত এমন বর্বরোচিত হামলা স্থানীয়দের নিরাপত্তাবোধকে নাড়িয়ে দিয়েছে। খবর ছড়িয়ে পড়তেই ঘটনাস্থলে ভিড় করেন শত শত মানুষ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গিয়ে পুলিশের সঙ্গে উত্তেজিত জনতার ধস্তাধস্তি হয় এবং ইটপাটকেলের আঘাতে অন্তত ৬ থেকে ৭ জন পুলিশ সদস্য আহত হন।
স্থানীয় সূত্র জানায়, কয়েক বছর আগে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যান পরিবারের কর্তা কামাল উদ্দিন। এরপর স্বামীহারা শাহিনুর বেগম সীমাহীন কষ্টের মধ্যেও তিন মেয়েকে মানুষ করার সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছিলেন। বড় মেয়ে সায়মা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছিলেন। পরিবারের স্বপ্ন ছিল উচ্চশিক্ষার মাধ্যমে মেয়েদের প্রতিষ্ঠিত করা। কিন্তু এক নির্মম হামলায় মুহূর্তেই রক্তাক্ত পরিণতি ঘটে সেই স্বপ্নের।
ঘটনার পরপরই স্থানীয়রা সন্দেহভাজন যুবক অন্তর মজুমদারকে আটক করে গণপিটুনি দেন। পরে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালে ভর্তি করে। অবস্থার অবনতি হলে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়। নিহত অন্তর মজুমদার নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলার বাসিন্দা এবং পেশায় ভ্রাম্যমাণ ফল বিক্রেতা ছিলেন। তিনি নিহত পরিবারের সঙ্গে একই ভবনে ভাড়া থাকতেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে হত্যাকাণ্ডের পেছনে প্রেমঘটিত বিরোধ, ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব অথবা আর্থিক লেনদেনসংক্রান্ত বিরোধের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কোনো কারণ নিশ্চিত করতে রাজি নয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
রায়পুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. বাহারুল আলম জানান, হাসপাতালে আনার পর শাহিনুর বেগম, ইকরা ও শিফাকে মৃত ঘোষণা করা হয়। গুরুতর আহত সায়মাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানো হলেও শেষ পর্যন্ত তিনিও মারা যান। নিহতদের শরীরের বিভিন্ন স্থানে ধারালো অস্ত্রের একাধিক আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে।
ঘটনার পর রায়পুর থানা পুলিশ, সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিট এবং পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে গুরুত্বপূর্ণ আলামত সংগ্রহ করেছেন। মূল সন্দেহভাজনের মৃত্যুর পর হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য উদঘাটনে আশপাশের বাসিন্দা, স্বজন ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
রায়পুর সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার মো. আব্দুর রাশেদ বলেন, "ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটনে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত চলছে। বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে। তদন্ত শেষে বিস্তারিত জানানো হবে।"
লক্ষ্মীপুর জেলা পুলিশ সুপার আবু তারেকও বলেন, "হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ উদঘাটনে পুলিশ সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে। তদন্ত শেষ হলে বিস্তারিত জানানো হবে।"
তবে বৃহস্পতিবার বিকেল ৫টা পর্যন্ত এ ঘটনায় কোনো মামলা দায়ের হয়নি বলে জানিয়েছে পুলিশ।
এদিকে, গোডাউন রোড এলাকায় নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। স্থানীয় বাসিন্দা কামাল হোসেন, সবুজ মিয়া ও ইতি বেগমসহ অনেকে বলেন, "এমন ভয়াবহ ঘটনা আমরা আগে কখনো দেখিনি। একটি পরিবারের চারজন মানুষকে এভাবে হত্যা করা হবে, তা কল্পনাও করতে পারিনি। আমরা দ্রুত ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদঘাটন এবং জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তি চাই।"
নিহতদের স্বজন, প্রতিবেশী ও সচেতন নাগরিকদের দাবি, দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ উদঘাটন করে আইন অনুযায়ী দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। তাদের মতে, এমন নৃশংস ঘটনার সুষ্ঠু বিচার না হলে সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা আরও বাড়বে।
রায়পুরের সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে আলোচিত ও হৃদয়বিদারক এই হত্যাকাণ্ড এখন পুরো দেশকে নাড়া দিয়েছে। তবে প্রেমঘটিত বিরোধ, ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব কিংবা আর্থিক লেনদেন—কোনটি এই রক্তাক্ত ঘটনার নেপথ্যে, তা এখনও নিশ্চিত নয়। তদন্ত শেষ হওয়ার পরই এ বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
২৭/২, দূর্গাপুর, উপর রাজারামপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৬৩০০
২০২৫ © দৈনিক অধিকার কতৃক সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত