কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে পাবলিক পরীক্ষা চলাকালীন সময়ে ১৪৪ ধারা কার্যকর থাকা অবস্থায় চাঁপাইনবাবগঞ্জের নবাবগঞ্জ সরকারি কলেজ মাঠে হোন্ডা মোটরসাইকেলের আয়োজনে ‘ম্যাংগো ফেস্ট’ অনুষ্ঠিত হওয়াকে ঘিরে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। পরীক্ষা চলাকালীন উচ্চস্বরে ডিজে সাউন্ড ও মাইক বাজানোর কারণে পরিবেশ দূষণ এবং পরীক্ষার্থীদের চরম ভোগান্তির অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি নিয়ে শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও সচেতন মহলে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। একই ঘটনায় অনুমতি প্রদান, দায়িত্বশীলদের ভূমিকা এবং ১৪৪ ধারা বাস্তবায়ন নিয়েও নানা প্রশ্ন উঠেছে।
শনিবার (২৭ জুন) দিনব্যাপী নবাবগঞ্জ সরকারি কলেজ মাঠে হোন্ডা মোটরসাইকেলের উদ্যোগে ‘ম্যাংগো ফেস্ট’ অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে মোটরসাইকেল শোভাযাত্রা, বিভিন্ন প্রতিযোগিতা, বিনোদনমূলক আয়োজন এবং সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেরও প্রস্তুতি নেওয়া হয়। আয়োজকদের পক্ষ থেকে বিকেলে কেক কেটে উৎসব উদ্বোধনের পরিকল্পনাও ছিল।
অন্যদিকে, একই দিন কলেজ ক্যাম্পাসেই কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে বেসিক ৩৬০ ঘণ্টা কোর্সের সমাপনী পরীক্ষা-২০২৬ অনুষ্ঠিত হয়। কলেজের মনিমুল হক ভবনের ৫১০১ ও ৫১০২ নম্বর কক্ষে অফিস অ্যাপ্লিকেশন ও ডাটাবেজ প্রোগ্রামিং বিষয়ের পরীক্ষায় প্রায় ১২০ জন শিক্ষার্থী অংশ নেন।
জানা গেছে, সকাল ১০টা থেকে ১১টা পর্যন্ত লিখিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর সকাল সাড়ে ১১টা থেকে দুপুর দেড়টা পর্যন্ত প্রথম গ্রুপের ভাইভা এবং দুপুর দেড়টা থেকে বিকেল সাড়ে ৩টা পর্যন্ত দ্বিতীয় গ্রুপের মৌখিক পরীক্ষা চলে।
সরেজমিনে দেখা যায়, কলেজের মূল ফটকে কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষার নোটিশ টাঙানো রয়েছে। সেখানে পরীক্ষা চলাকালীন ১৪৪ ধারা জারির বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু সেই নোটিশের অল্প দূরেই দিনভর উচ্চক্ষমতার সাউন্ড বক্সে গান ও ডিজে মিউজিক বাজানো হচ্ছিল।
পরীক্ষা চলাকালীন সময়েও মাইক ও সাউন্ড সিস্টেম বন্ধ না থাকায় শব্দ সরাসরি পরীক্ষা কক্ষ পর্যন্ত পৌঁছায় বলে অভিযোগ করেন শিক্ষার্থীরা।
পরীক্ষার্থী সোহেল রানা বলেন,“লিখিত পরীক্ষা শুরু হওয়ার পর থেকেই কলেজ মাঠে খুব জোরে গান বাজছিল। শব্দ পরীক্ষা কক্ষ পর্যন্ত আসছিল। মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছিল।”
আরেক পরীক্ষার্থী আব্দুর রহমান বলেন,“পরীক্ষার সময় এমন উচ্চস্বরে মাইক বাজানো উচিত হয়নি। আমরা বাধ্য হয়েই পরীক্ষা দিয়েছি। ভবিষ্যতে যেন এমন পরিস্থিতি না হয়, সেটাই চাই।”
পরীক্ষার্থী অভিভাবক রফিকুল ইসলাম বলেন,“একদিকে পাবলিক পরীক্ষা, অন্যদিকে একই ক্যাম্পাসে ডিজে সাউন্ডে অনুষ্ঠান—এটা সত্যিই বিস্ময়কর। ১৪৪ ধারা জারি থাকা অবস্থায় এমন আয়োজন কীভাবে হলো, সেটি খতিয়ে দেখা দরকার।”
[caption id="attachment_12045" align="alignnone" width="730"]
নবাবগঞ্জ সরকারি কলেজে কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের সমাপনী পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়।[/caption]
তিনি আরও অভিযোগ করেন, অনুষ্ঠানস্থলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের দায়িত্ব পালন করতে দেখা গেলেও পরীক্ষার্থীদের স্বার্থে শব্দ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ চোখে পড়েনি।
হোন্ডা মোটরসাইকেলের চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি শিশির মুঠোফোনে বলেন,“প্রায় এক মাস আগে কলেজ কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়েই আমরা অনুষ্ঠান আয়োজন করেছি। পুলিশের সঙ্গেও সমন্বয় ছিল। আজ কলেজে পরীক্ষা ছিল-এ তথ্য আমাদের জানা ছিল না।”
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইকরামুল হোসাইন বলেন,“এই ম্যাংগো ফেস্ট আয়োজনের বিষয়ে থানা থেকে কোনো অনুমতি নেওয়া হয়নি। এমন আয়োজনের বিষয়েও আমাদের জানা ছিল না।”
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ওয়াসিম ফিরোজ বলেন,“আমাদের কাছ থেকেও এ ধরনের কোনো অনুমতি নেওয়া হয়নি। পরীক্ষা চলাকালীন কলেজ কর্তৃপক্ষ কেন অনুষ্ঠান আয়োজনের অনুমতি দিল, সেটি তারাই ভালো বলতে পারবেন।”
নবাবগঞ্জ সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ জানান,“হোন্ডা কোম্পানি প্রায় এক মাস আগে মাঠ ব্যবহারের অনুমতি নিয়েছিল। পরে হঠাৎ করেই কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষার সূচি আসে। পরীক্ষা মূল মাঠে নয়, কিছুটা দূরের ভবনে অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে মাঠে বিভিন্ন আয়োজন নিয়ে আমরাও সন্তুষ্ট নই।”
ঘটনাটি ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে-১৪৪ ধারা জারি থাকা অবস্থায় একই ক্যাম্পাসে উচ্চস্বরে সাংস্কৃতিক ও বাণিজ্যিক অনুষ্ঠান কীভাবে চলল?।পরীক্ষা চলাকালীন শব্দদূষণ রোধে দায়িত্বশীলদের পক্ষ থেকে কার্যকর ব্যবস্থা কেন নেওয়া হয়নি? আয়োজকদের দাবি ও পুলিশের বক্তব্যে অনুমতির বিষয়ে কেন ভিন্নতা দেখা গেল?
পরীক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ সময়ে শিক্ষার্থীদের নিরবচ্ছিন্ন পরিবেশ নিশ্চিত করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের। এ ঘটনায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো তদন্ত বা পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না, সেটিও এখন দেখার বিষয়।
২৭/২, দূর্গাপুর, উপর রাজারামপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৬৩০০
২০২৫ © দৈনিক অধিকার কতৃক সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত