চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভোলাহাট উপজেলার তেলীপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক সহকারী শিক্ষকের বিরুদ্ধে প্রশ্নপত্র ফাঁস, শিক্ষার্থীদের প্রাইভেট পড়তে বাধ্য করা এবং প্রাইভেটে অংশ না নেওয়া শিক্ষার্থীদের মানসিকভাবে হয়রানির মতো গুরুতর অভিযোগে বিভাগীয় মামলা (Departmental Proceedings) দায়ের করেছে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস। ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর এলাকাজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। সরকারি প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থায় এমন অভিযোগ শিক্ষার নৈতিকতা ও স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস থেকে ২৮ জুন ২০২৬ তারিখে জারি করা অভিযোগনামা সূত্রে জানা যায়, অভিযুক্ত শিক্ষক মো. সেলিম রেজা বর্তমানে ভোলাহাট উপজেলার তেলীপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মরত। পাশাপাশি তিনি ছোট জামবাড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সংযুক্ত রয়েছেন।
অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, তিনি পঞ্চম শ্রেণির প্রথম প্রান্তিক মূল্যায়ন পরীক্ষার প্রশ্নপত্র শিক্ষার্থী মিফতাহা সাবার মা রোকসানা আক্তারের কাছে আগাম সরবরাহ করেন। এছাড়া তিনি নিজের বাসায় শিক্ষার্থীদের প্রাইভেট পড়তে বাধ্য করতেন এবং যারা তার কাছে প্রাইভেট পড়তে যেত না, তাদের বিভিন্নভাবে মানসিক চাপ, ভয়ভীতি ও হয়রানির মুখে ফেলতেন বলেও অভিযোগে বলা হয়েছে।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস জানায়, অভিযোগের পর উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. রিয়াজুল ইসলাম বিষয়টি তদন্ত করেন। তদন্ত শেষে দাখিল করা প্রতিবেদনে অভিযোগগুলোর প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে বলে উল্লেখ করা হয়। সেই প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই অভিযুক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়।
এর পরিপ্রেক্ষিতে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮-এর ৩(খ) ধারায় বর্ণিত 'অসদাচরণ (Misconduct)'-এর অভিযোগে মো. সেলিম রেজার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে বিভাগীয় মামলা রুজু করা হয়েছে।
অভিযোগনামায় আরও বলা হয়েছে, অভিযুক্ত শিক্ষককে লিখিতভাবে কারণ দর্শানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কেন তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে না, সে বিষয়ে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে লিখিত জবাব দিতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে ব্যক্তিগত শুনানিতে উপস্থিত থেকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগও তাকে দেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সহকারী শিক্ষক মো. সেলিম রেজা বলেন, "আমার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়েছে, বিষয়টি আমি জানি এবং নোটিশও পেয়েছি।"
শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রশ্নপত্র ফাঁস, প্রাইভেট বাণিজ্য এবং কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ওপর মানসিক চাপ সৃষ্টি—এ ধরনের অভিযোগ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এতে শুধু শিক্ষাব্যবস্থার স্বচ্ছতা নয়, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের আস্থাও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তারা অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, দোষীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং সরকারি বিদ্যালয়ে প্রাইভেট বাণিজ্য বন্ধে কার্যকর নজরদারির দাবি জানিয়েছেন।
এদিকে সচেতন অভিভাবকদের মতে, সরকারি বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক যদি প্রশ্নপত্র ফাঁস কিংবা প্রাইভেট বাণিজ্যের মতো অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন, তবে তা পুরো শিক্ষা ব্যবস্থার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে। তারা এ ধরনের অভিযোগে দ্রুত, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত সম্পন্ন করে আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
তবে উল্লেখ্য, বিভাগীয় মামলা দায়ের হওয়া মানেই অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া নয়। তদন্ত, লিখিত জবাব, শুনানি এবং বিভাগীয় কার্যক্রম শেষে কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ভিত্তিতেই পরবর্তী প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
২৭/২, দূর্গাপুর, উপর রাজারামপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৬৩০০
২০২৫ © দৈনিক অধিকার কতৃক সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত