মাদকবিরোধী অভিযান নিয়মিত চললেও রাজশাহীতে বিচারিক প্রক্রিয়ার শ্লথ গতির কারণে মাদক মামলার সংখ্যা এখন উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, দেশের একক জেলা হিসেবে সবচেয়ে বেশি প্রায় ২৫ হাজার ৬৭১টি মাদক মামলা এখন রাজশাহীর বিভিন্ন আদালতে বিচারাধীন অবস্থায় পড়ে আছে। এতে করে ভুক্তভোগী, পুলিশ-প্রশাসন এবং বিচার বিভাগ—সবাইকেই বাড়তি চাপ সামলাতে হচ্ছে।
কিছুদিন আগে এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছিলেন, সারাদেশে বর্তমানে ৮০ হাজারের বেশি মাদক মামলা বিচারের অপেক্ষায় আছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মামলা রাজশাহীতে, এরপরের অবস্থানে চট্টগ্রাম বিভাগের বিভিন্ন জেলা (প্রায় ৩৯ হাজার) এবং ঢাকা মহানগর (প্রায় ১৮ হাজার)।
আইনজীবীদের ভাষ্যমতে, সাক্ষীরা নির্দিষ্ট তারিখে আদালতে উপস্থিত না হওয়া এবং সাক্ষ্যগ্রহণ কার্যক্রম নিয়মিতভাবে না চলাই মামলাজটের প্রধান কারণ। বারবার সমন পাঠানোর পরও অনেক সাক্ষী হাজির হন না, আবার তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থাও নেওয়া হয় না। এভাবেই মামলাগুলো বছরের পর বছর ঝুলে থাকছে।
রাজশাহী আইনজীবী সমিতির সদস্য অ্যাডভোকেট সালাহউদ্দিন বিশ্বাস বলেন, সাক্ষীদের আদালতে হাজির করানোর দায়িত্ব মূলত রাষ্ট্রপক্ষের হলেও এক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় তৎপরতার অভাব লক্ষ করা যাচ্ছে। তার মতে, সময়মতো সাক্ষ্য না নেওয়া গেলে মামলা নিষ্পত্তি বিলম্বিত হতেই থাকবে।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ২০১৮ সালের ১০ জুলাই গোদাগাড়ীর সুলতানগঞ্জ এলাকা থেকে সোয়া এক কেজির বেশি হেরোইনসহ নুরুল ইসলাম নামের একজনকে আটক করেছিল র্যাব। তার নামে আরও তিনটি মাদক মামলা রয়েছে এবং বর্তমান মামলাটি রাজশাহী বিভাগীয় বিশেষ জজ আদালতে চলমান। প্রায় আড়াই বছর ধরে সাক্ষ্যগ্রহণ চললেও ১৪ জন সাক্ষীর মধ্যে মাত্র দুজন সাক্ষ্য দিয়েছেন। বাকিরা একাধিকবার সমন পেয়েও আদালতমুখী হননি, এমনকি জামিনে থাকা আসামিও নিয়মিত হাজিরা বন্ধ করে দিয়েছেন। ফলে মামলাটি এখনো নিষ্পত্তি হয়নি।
এমন হাজারো নজির রয়েছে রাজশাহীর আদালতগুলোয়। নতুন মামলা যুক্ত হলেও পুরোনো মামলা নিষ্পত্তির গতি অত্যন্ত মন্থর হওয়ায় প্রতিদিনই বাড়ছে জটের পরিমাণ।
মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সূত্র অনুযায়ী-চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে বিচারাধীন ৬,৭৪৯টি মামলা।মহানগর দায়রা জজ আদালতে ৭,১৬০টি মামলা।চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ৯,৩৫৫টি মামলা। জেলা ও দায়রা জজসহ অন্যান্য আদালতে ৩,৬০৭টি মামলা। এ ছাড়া বিভিন্ন বিশেষ ট্রাইব্যুনাল ও বিশেষ আদালতেও বহু মামলা দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে আছে।
চলতি বছরের এপ্রিল-মে দুই মাসেই রাজশাহীতে বিভিন্ন বাহিনীর মাদকবিরোধী অভিযানে শত শত ব্যক্তি গ্রেপ্তার এবং নতুন মামলা দায়ের হয়েছে। এই সময়ে ডিএনসি ২৬৯টি অভিযান চালিয়ে ১৪২ জনকে গ্রেপ্তার করে ১৫৪টি মামলা করেছে। জেলা পুলিশ ৪৮৩টি অভিযানে ১২৯ জনকে গ্রেপ্তার করে করেছে ৯৪টি মামলা। মহানগর পুলিশ ৭৬৯টি অভিযানে ১৩৬ জনকে গ্রেপ্তার করে দায়ের করেছে ১২৫টি মামলা। পাশাপাশি বিজিবি ও র্যাবও মাদক উদ্ধার ও গ্রেপ্তার অভিযানে সক্রিয় ছিল এই সময়ে।
আইনজীবীরা বলছেন, বর্তমান ধীরগতিতে বিচারকাজ চললে মামলাজট কমানো কঠিন হবে। এজন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন, সাক্ষী হাজিরে কঠোর জবাবদিহিতা এবং তদন্ত-প্রসিকিউশনের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো জরুরি বলে মত দিয়েছেন তারা।
তবে রাজশাহীর পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট রইসুল ইসলাম মনে করেন, শুধু রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের দায়ী করা ঠিক নয়। তদন্তে বিলম্ব, সাক্ষী হাজিরে পুলিশের অসহযোগিতা, আসামিপক্ষের সময় চাওয়া এবং আদালতের ব্যস্ততা—সব মিলিয়েই এই জট তৈরি হয়েছে বলে তিনি মনে করেন। এই সংকট সমাধানে পুলিশ, প্রসিকিউশন ও বিচার বিভাগের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলে তিনি জানান।
জেলা মাদক নিয়ন্ত্রণ ও প্রচার কমিটির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম বলেন, স্বল্প সময়ের মধ্যে বিপুল সংখ্যক মামলা কীভাবে নিষ্পত্তি করা যায়, সে বিষয়ে আসন্ন কমিটির সভায় বিস্তারিত আলোচনা হবে।
২৭/২, দূর্গাপুর, উপর রাজারামপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৬৩০০
২০২৫ © দৈনিক অধিকার কতৃক সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত