রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (রামেবি) স্থাপন প্রকল্প এলাকায় নথিপত্রে উল্লেখ থাকা প্রায় ৮ হাজার গাছের কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। জমি অধিগ্রহণের কাগজপত্র, নিলামে বিক্রি হওয়া গাছের সংখ্যা এবং বর্তমানে প্রকল্প এলাকায় থাকা গাছের প্রকৃত হিসাবের মধ্যে বড় ধরনের গরমিল ধরা পড়েছে। বিষয়টি সামনে আসার পর স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে বিস্তারিত ব্যাখ্যা তলব করেছেন।
মঙ্গলবার সকালে স্বাস্থ্যমন্ত্রী রামেবির উপাচার্য অধ্যাপক ডা. জাওয়াদুল হকের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেন এবং প্রকল্প এলাকায় মোট কতটি গাছ ছিল, কতটি বিক্রি হয়েছে ও বর্তমানে কতটি অবশিষ্ট আছে তার পূর্ণাঙ্গ তথ্য জানতে চান। এরপর উপাচার্য নিজে গিয়ে প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করেন।
উপাচার্যের ভাষ্যমতে, তিন ধাপে নিলামের মাধ্যমে মোট ২ হাজার ৬৪২টি গাছ ২৬ লাখ ১২ হাজার ৫৭০ টাকায় বিক্রি করা হয়েছে এবং নিলামে বিক্রীত গাছ ব্যতীত অন্য কোনো গাছ কাটা হয়নি বলে তিনি দাবি করেন।
তবে প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র ও স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ ভিন্ন। তাদের দাবি অনুযায়ী, নিলাম প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়েও বিপুল সংখ্যক গাছ কাটা হয়েছে। বিশেষভাবে গত বছরের আগস্ট থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে টেন্ডার শুরুর আগেই ব্যাপক হারে গাছ কাটা হয়েছিল বলে অভিযোগ উঠেছে।
জেলা প্রশাসনের ২০২৩ সালের ১ জুন প্রস্তুতকৃত ভূমি অধিগ্রহণ সংক্রান্ত নথিতে দেখা যায়, প্রকল্প এলাকায় মোট ২৫ হাজার ৮৪২টি গাছ ছিল। এর মধ্যে ১৩ হাজার ৯৬৩টি কলাগাছ এবং বাকি ১১ হাজার ৮৭৯টি বিভিন্ন প্রজাতির কাঠ ও ফলদ গাছ। নিলামে বিক্রি হওয়া গাছ বাদ দিলে হিসাব অনুযায়ী এখনো অন্তত ৯ হাজার ২৩৭টি গাছ থাকার কথা থাকলেও সরেজমিনে দেখা গেছে, বাস্তবে এক হাজারেরও কম গাছ রয়ে গেছে সেখানে।
অভিযোগ আছে, নিলামে গাছ কেনা প্রতিষ্ঠানগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাবশালী একটি চক্রের সহায়তায় অনুমোদিত সংখ্যার চেয়ে অনেক বেশি গাছ কেটে নিয়ে গেছে। এর ফলে প্রায় ৮ হাজার গাছের কোনো হিসাব মিলছে না, যার আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ৮০ লাখ টাকা বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
গত বছরের ২০ আগস্ট প্রকল্প এলাকা পরিদর্শনে গিয়ে দেখা যায়, সীমানাপ্রাচীর নির্মাণের অজুহাতে শত শত গাছ ইতিমধ্যে কেটে ফেলা হয়েছে। স্থানীয়রা তখনই জানিয়েছিলেন, মাসের পর মাস ধরে ট্রলিভর্তি করে গাছ সরিয়ে নেওয়া হচ্ছিল, অথচ সে সময়ে কোনো নিলামই সম্পন্ন হয়নি। পরবর্তীতে বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রকাশ পাওয়ার পর গাছ কাটা বন্ধ হয় এবং সেপ্টেম্বর মাসে আনুষ্ঠানিকভাবে নিলাম প্রক্রিয়া শুরু হয়।
এ প্রসঙ্গে উপাচার্য অধ্যাপক ডা. জাওয়াদুল হক বলেন, মন্ত্রীর নির্দেশনা পাওয়ার পরপরই তিনি নিজে প্রকল্প এলাকা ঘুরে দেখেছেন এবং তার কাছেও মনে হয়েছে সেখানে বর্তমানে মাত্র প্রায় এক হাজারের মতো গাছ অবশিষ্ট আছে। বাকি গাছগুলো কোথায় গেল তা তিনি নিজেও বুঝতে পারছেন না বলে জানান। প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারণে একজন উপসহকারী প্রকৌশলীকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
ভূমি অধিগ্রহণের সময় গাছের সংখ্যা বাড়িয়ে দেখানো হয়েছিল কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে উপাচার্য বলেন, ক্ষতিপূরণের পরিমাণ বাড়ানোর উদ্দেশ্যে অনেক সময় এ ধরনের সংখ্যা বাড়িয়ে দেখানোর ঘটনা ঘটে থাকে এবং এখানেও তেমনটি ঘটে থাকতে পারে বলে তার ধারণা।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, শুরু থেকেই রামেবি স্থাপন প্রকল্পকে ঘিরে অনিয়ম ও দুর্নীতির নানা অভিযোগ উঠে এসেছে। দীর্ঘ সময় পার হলেও এখনো বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল অবকাঠামো নির্মাণকাজ শুরু হয়নি। বর্তমানে প্রকল্প এলাকায় শুধু প্রধান ফটক নির্মাণের কাজ দৃশ্যমান রয়েছে।
২৭/২, দূর্গাপুর, উপর রাজারামপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৬৩০০
২০২৫ © দৈনিক অধিকার কতৃক সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত