ময়মনসিংহের ধোবাউড়ায় শিশু নিছামনি সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও হত্যা মামলার রায় মাত্র ২৫ দিনের মধ্যে ঘোষণা হয়েছে। ঘটনার মাত্র ৯ দিনের মাথায় পুলিশ অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করে এবং পরবর্তী ১৬ দিনের মধ্যেই বিচার কার্যক্রম শেষ করে আদালত রায় দেন। সংশ্লিষ্টদের মতে, তদন্ত, অভিযোগপত্র দাখিল এবং বিচার—সব মিলিয়ে এত অল্প সময়ে একটি হত্যা মামলার নিষ্পত্তি দেশের বিচারিক ইতিহাসে অত্যন্ত বিরল।
বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) ময়মনসিংহের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল এবং শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনাল পৃথকভাবে এ মামলার রায় ঘোষণা করেন।
আদালত তিন প্রাপ্তবয়স্ক আসামি—আরিফ, রাকিব ও সিয়ামকে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯(৩) ধারা অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ড দেন। একই সঙ্গে প্রত্যেককে ২ লাখ টাকা করে অর্থদণ্ড করা হয়। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, এই অর্থ নিহত শিশুর পরিবারকে প্রদান করতে হবে।
অপরদিকে, অপ্রাপ্তবয়স্ক আসামি মারুফকে শিশু আদালত ১০ বছরের কারাদণ্ড এবং দণ্ডবিধির ২০১ ধারায় আরও আড়াই বছরের কারাদণ্ড দেন। আদালত নির্দেশ দেন, উভয় সাজা একসঙ্গে কার্যকর হবে। মারুফ প্রাপ্তবয়স্ক না হওয়া পর্যন্ত শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে থাকবে, এরপর তাকে সাধারণ কারাগারে স্থানান্তর করা হবে।
গত ১৪ জুন বিকেলে ধোবাউড়া উপজেলার একটি এলাকায় শিশু নিছামনিকে সংঘবদ্ধভাবে ধর্ষণের পর নদীতে ফেলে হত্যা করা হয়। পরদিন ১৫ জুন নিহত শিশুর বাবা ধোবাউড়া থানায় মামলা দায়ের করেন।
মামলাটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত শুরু করে ধোবাউড়া থানা পুলিশ। মাত্র ৯ দিনের মধ্যে তদন্ত সম্পন্ন করে ২৩ জুন চার আসামির বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। এরপর দ্রুত সাক্ষ্যগ্রহণ ও বিচারিক কার্যক্রম শেষে ঘটনার ২৫তম দিনে আদালত রায় ঘোষণা করেন।
মামলাটির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নিবিড়ভাবে তদারকি করেন ময়মনসিংহ জেলা পুলিশের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ কামরুল হাসান। তদন্ত, আলামত সংগ্রহ, সাক্ষ্য-প্রমাণ উপস্থাপন এবং বিচার কার্যক্রমের প্রতিটি ধাপ তিনি সরাসরি পর্যবেক্ষণ করেন।
রায় ঘোষণার পর পুলিশ সুপার বলেন,
"মামলাটি আমি ব্যক্তিগতভাবে তদারকি করেছি। তদন্ত কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যরা সর্বোচ্চ আন্তরিকতা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে কাজ করেছেন। তাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফলেই দ্রুত তদন্ত সম্পন্ন করা সম্ভব হয়েছে। একই সঙ্গে দ্রুত বিচার কার্যক্রম সম্পন্ন করায় বিচার বিভাগের মাননীয় বিচারকসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে পুলিশের পক্ষ থেকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই।"
সমাজ রূপান্তর সংগঠনের সভাপতি ইমতিয়াজ আহমেদ জানান "এত অল্প সময়ের মধ্যে একটি হত্যা মামলার তদন্ত, অভিযোগপত্র দাখিল এবং বিচার কার্যক্রম সম্পন্ন হতে আমি এই প্রথম দেখলাম। এ মামলায় ময়মনসিংহ জেলা পুলিশের পুলিশ সুপার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। দেশের বিচারিক ইতিহাসে দ্রুত তদন্ত ও বিচার সম্পন্ন করতে পুলিশের এমন সমন্বিত ভূমিকা একটি ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত। একই সঙ্গে ময়মনসিংহের বিচার বিভাগ ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়েছে।"
নিছামনি ধর্ষণ ও হত্যা মামলার রায় কেবল একটি মামলার নিষ্পত্তি নয়; এটি দেখিয়েছে, তদন্তকারী সংস্থা, প্রসিকিউশন ও বিচার বিভাগ সমন্বিতভাবে কাজ করলে জঘন্য অপরাধের বিচার দীর্ঘসূত্রতার শিকার না হয়েও দ্রুত সম্পন্ন করা সম্ভব। একই সঙ্গে এ রায় শিশু ও নারী নির্যাতনের মতো ভয়াবহ অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর বার্তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
তবে উল্লেখ্য, নিম্ন আদালতের মৃত্যুদণ্ডের রায় কার্যকর হওয়ার আগে আইন অনুযায়ী উচ্চ আদালতের অনুমোদন (ডেথ রেফারেন্স) এবং আপিলের সুযোগ রয়েছে।
২৭/২, দূর্গাপুর, উপর রাজারামপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৬৩০০
২০২৫ © দৈনিক অধিকার কতৃক সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত