চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার খোসালপাড়া গ্রামের সন্তান মো. মাহফুজুল হকের জীবন থেমে গেল যুক্তরাষ্ট্রের এক ব্যস্ত সড়কে। পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে প্রবাসে নিরলস পরিশ্রম করা এই বাংলাদেশি খাবার ডেলিভারি কর্মী দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত হয়েছেন। তার মৃত্যুতে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত বাংলাদেশি কমিউনিটির পাশাপাশি নিজ গ্রাম খোসালপাড়ায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া।
স্থানীয় সময় মঙ্গলবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়া অঙ্গরাজ্যের ফিলাডেলফিয়ায় খাবার ডেলিভারি দিতে গিয়ে এ হামলার শিকার হন মাহফুজুল।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, মাহফুজুল হকের গ্রামের বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার গোমস্তাপুর উপজেলার খোসালপাড়া গ্রামে। তার বাবা মরহুম মোজাম্মেল হক গোমস্তাপুর পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের একজন সম্মানিত শিক্ষক ছিলেন। মা মনোয়ারা বেগম গোমস্তাপুর আব্দুল হামিদ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষিকা। একটি শিক্ষিত ও সুনামধন্য পরিবারের সন্তান মাহফুজুল জীবিকার তাগিদে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমিয়েছিলেন।
জানা গেছে, তিনি ফিলাডেলফিয়ার নর্থইস্ট এলাকায় বসবাস করতেন। এর আগে আল-শাম উইলো গ্রোভে কর্মরত ছিলেন। পরে জীবিকার প্রয়োজনে খাবার সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ডোরড্যাশ (DoorDash)-এ ডেলিভারি কর্মী হিসেবে কাজ শুরু করেন। তার পরিবারে রয়েছেন স্ত্রী এবং মাত্র ১৪ বছর বয়সী এক সন্তান।
এনবিসি১০ ফিলাডেলফিয়ার খবরে বলা হয়, গুলির খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মাহফুজুল হককে মাথার পেছনে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় উদ্ধার করে। দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হলেও চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
ঘটনাস্থলে একটি চালু অবস্থায় থাকা গাড়ি এবং একটি ডোরড্যাশ ডেলিভারি ব্যাগ পাওয়া যায়। তদন্তে পুলিশ জানতে পারে, যে ঠিকানায় মাহফুজুল খাবার পৌঁছে দিতে যাচ্ছিলেন, সেই বাসার বাসিন্দারা কোনো খাবারের অর্ডারই করেননি। এতে হত্যাকাণ্ডের রহস্য আরও গভীর হয়েছে।
তদন্তকারীরা ঘটনাস্থল থেকে রাইফেলের দুটি ব্যবহৃত গুলির খোসা উদ্ধার করেছেন। পুলিশের ধারণা, খুব কাছ থেকে তাকে গুলি করা হয়েছে এবং এটি একটি পরিকল্পিত বা লক্ষ্যভিত্তিক হামলা হতে পারে।
এ ঘটনায় মুখোশ পরা গাঢ় রঙের পোশাকধারী তিনজনকে সন্দেহভাজন হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত তাদের পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি। ঘটনাস্থল থেকে কিছু দূরে একটি খাবারভর্তি ব্যাগও উদ্ধার হয়েছে, যার সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
ঘটনার পর ডোরড্যাশ এক বিবৃতিতে গভীর শোক প্রকাশ করে জানিয়েছে, নিহতের পরিবার ও স্বজনদের প্রতি সমবেদনা জানানো হচ্ছে এবং তদন্তে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করা হবে।
মাহফুজুলের মৃত্যুর সংবাদ ছড়িয়ে পড়তেই চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার খোসালপাড়া গ্রামে শোকের আবহ তৈরি হয়েছে। আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী ও পরিচিতজনরা তার অকাল মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। অনেকেই বলেছেন, একজন শিক্ষক পরিবারের সন্তান হিসেবে মাহফুজুল ছিলেন অত্যন্ত ভদ্র, পরিশ্রমী ও স্বপ্নবাজ মানুষ।
একটি সুন্দর ভবিষ্যতের আশায় দেশ ছেড়ে প্রবাসে যাওয়া মাহফুজুলের জীবন শেষ হলো কর্মরত অবস্থাতেই। তার মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের নয়, গোমস্তাপুরের মানুষের কাছেও এক অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে রইল। এখন তার স্বজনদের একটাই প্রত্যাশা—হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য উদঘাটন হোক এবং দায়ীদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হোক।
২৭/২, দূর্গাপুর, উপর রাজারামপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৬৩০০
২০২৫ © দৈনিক অধিকার কতৃক সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত