২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের উত্তাল সময়ে রাজধানীর গেন্ডারিয়ার কিশোর শাহরিয়ার খান আনাসের নাম আজও স্মরণ করেন অনেকে। মাত্র ১৬ বছর বয়সী এই শিক্ষার্থী আন্দোলনে যাওয়ার আগে মায়ের উদ্দেশে একটি চিঠি লিখে রেখে যান। পরিবারের অজান্তে ঘর থেকে বের হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই চানখাঁরপুল এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রাণ হারান তিনি। পরে তার লেখা সেই চিঠি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং বহু মানুষের হৃদয় স্পর্শ করে।
চিঠিতে আনাস লিখেছিলেন, তিনি আর ঘরে বসে থাকতে পারছেন না। দেশের জন্য রাজপথে নামা মানুষদের দেখে নিজের দায়িত্ববোধ থেকেই আন্দোলনে যোগ দিচ্ছেন। তিনি মায়ের কাছে ক্ষমা চেয়ে লেখেন, যদি আর ফিরে না আসেন, তবে যেন তার জন্য শোক নয়, বরং গর্ব করা হয়।
গেন্ডারিয়ার আদর্শ একাডেমির দশম শ্রেণির বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী আনাস ছিলেন অত্যন্ত শান্ত, ধর্মভীরু ও পরিবারমুখী। ছোট দুই ভাইকে ছাড়া খাবার খেতেন না, কখনো অযথা কোনো আবদারও করতেন না। দাদির মৃত্যুর পর তার ব্যবহৃত জায়নামাজে নিয়মিত নামাজ আদায় করতেন এবং দীর্ঘ সময় দোয়া করতেন।
পরিবারের সদস্যরা জানান, জুলাইয়ের সহিংসতা বাড়তে থাকলে আনাস গভীরভাবে বিচলিত হয়ে পড়েন। বাবা-মা তাকে আন্দোলন থেকে দূরে রাখতে চাইলেও শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার খবর তাকে মানসিকভাবে নাড়া দেয়। ৪ আগস্ট লংমার্চে অংশ নেওয়ার আহ্বান শুনে তিনি আন্দোলনে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। বাবা তাকে পরে নিয়ে যাওয়ার আশ্বাস দিলেও তিনি অপেক্ষা করেননি।
৫ আগস্ট সকালে পরিবারের অগোচরে বের হওয়ার আগে আনাস একটি পুরোনো মোবাইল ফোন সঙ্গে নেন। আহতদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার উদ্দেশ্যে ব্যাগে রাখেন তুলা, ব্যান্ডেজ ও স্যাভলন। এরপর গেন্ডারিয়া থেকে হেঁটে পৌঁছে যান চানখাঁরপুল এলাকায়।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, মিছিলে থাকাকালে প্রথমে তার মাথায় রাবার বুলেট লাগে। পরে গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই তিনি লুটিয়ে পড়েন। আন্দোলনকারীরা দ্রুত তাকে হাসপাতালে নিয়ে গেলেও চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
আনাসের বাবা শাহরিয়ার খান পলাশ জানান, ঘটনার কিছুদিন পর একটি ভিডিও তাদের হাতে আসে, যেখানে ছেলের শেষ মুহূর্তের দৃশ্য দেখা যায়। তিনি বলেন, হাসপাতালে পরিচয়হীন হিসেবে মরদেহ সরিয়ে ফেলার আশঙ্কা তৈরি হলেও এক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর উদ্যোগে পরিবারের কাছে মরদেহ হস্তান্তর করা সম্ভব হয়।
তিনি আরও জানান, পরিবহন সংকটের কারণে ছেলের মরদেহ রিকশায় করে বাড়িতে নিয়ে যেতে হয়েছিল। পরে পরিবারের সিদ্ধান্তে তাকে দাদির কবরের পাশে দাফন করা হয়।
আনাসের মৃত্যুর পরও তাকে ভুলতে পারেনি পরিবার। ছোট দুই ভাই আজও বড় ভাইকে খোঁজে। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, আনাস শুধু একজন সন্তান নন, পরিবারের সবচেয়ে দায়িত্বশীল সদস্যদের একজন ছিলেন।
আনাসের মা সানজিদা খান বলেন, তারা এখনো নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন। বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে তাদের প্রত্যাশা পুরোপুরি পূরণ হয়নি বলেও তিনি উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে তিনি চান, ভবিষ্যতে যেন কোনো পরিবারকে এমন শোক বহন করতে না হয় এবং দেশে এমন পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি না ঘটে।
তিনি আরও বলেন, সন্তান হারানোর কষ্ট ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যেন নিরাপদ পরিবেশে বেড়ে উঠতে পারে এবং মানুষের প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটুক—এটাই তাদের পরিবারের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।
২৭/২, দূর্গাপুর, উপর রাজারামপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৬৩০০
২০২৫ © দৈনিক অধিকার কতৃক সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত