সম্প্রতি নেপালে আকস্মিক বন্যার ভয়াবহতা দক্ষিণ এশিয়ার দুর্যোগপ্রবণ দেশগুলোর সামনে নতুন করে নানা প্রশ্ন তুলে ধরেছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো নদীমাতৃক ও জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা দেশের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা কতটা প্রস্তুত ও কার্যকর—সেই আলোচনা আবারও সামনে এসেছে।
ভৌগোলিক অবস্থান ও প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যের কারণে বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন ধরনের দুর্যোগের ঝুঁকিতে রয়েছে। প্রতিবছর বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙনসহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগে মানুষের জীবন, অর্থনীতি ও অবকাঠামো ক্ষতির মুখে পড়ে।
২০২৪ সালের আগস্টের শেষ সপ্তাহে অতিভারী বৃষ্টি এবং ভারতের ত্রিপুরা অঞ্চল থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে বাংলাদেশের পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে ভয়াবহ বন্যা দেখা দেয়। কুমিল্লা, ফেনী, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, লক্ষ্মীপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল এই দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এই অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের দুর্যোগ মোকাবিলা ব্যবস্থার অগ্রগতির পাশাপাশি কিছু গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতাও সামনে নিয়ে আসে।
আগাম সতর্কবার্তা পৌঁছাতে ঘাটতি
বন্যার পূর্বাভাস ও সতর্কবার্তা দেওয়ার ব্যবস্থা থাকলেও প্রত্যন্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মানুষের কাছে দ্রুত, সহজবোধ্য এবং কার্যকরভাবে সেই তথ্য পৌঁছানো সব সময় সম্ভব হয় না। অনেক ক্ষেত্রে মানুষ দুর্যোগের তীব্রতা সম্পর্কে যথাসময়ে জানতে পারেন না।
উদ্ধার কার্যক্রমে সমন্বয়ের প্রয়োজন
দুর্যোগের সময় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও স্থানীয় জনগণ একযোগে কাজ করলেও কিছু এলাকায় কার্যকর সমন্বয়ের ঘাটতি দেখা যায়। ফলে উদ্ধার তৎপরতা ও জরুরি সহায়তা পৌঁছাতে বিলম্ব হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
দুর্গম এলাকায় ত্রাণ পৌঁছানোর চ্যালেঞ্জ
বন্যার সময় সড়ক ও যোগাযোগব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হলে পানিবন্দি মানুষের কাছে খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, ওষুধ এবং অন্যান্য জরুরি সহায়তা পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে দুর্গম ও বিচ্ছিন্ন এলাকার মানুষের জন্য এই সমস্যা আরও প্রকট।
আশ্রয়কেন্দ্রের সীমাবদ্ধতা
দুর্যোগের সময় নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র মানুষের জীবন রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে অনেক এলাকায় আশ্রয়কেন্দ্রের ধারণক্ষমতা, বিশুদ্ধ পানি, স্যানিটেশন এবং নারী, শিশু ও বয়স্কদের জন্য প্রয়োজনীয় সুবিধার ঘাটতি রয়েছে।
জরুরি সরঞ্জাম ও স্থানীয় সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি
দুর্যোগ মোকাবিলায় পর্যাপ্ত নৌযান, উদ্ধার সরঞ্জাম, চিকিৎসাসামগ্রী এবং প্রশিক্ষিত জনবল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং তাৎক্ষণিক সাড়া দেওয়ার সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
বাঁধ ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার দুর্বলতা
কিছু এলাকায় দুর্বল বাঁধ, অপর্যাপ্ত পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ও জলাবদ্ধতা বন্যার ক্ষয়ক্ষতি বাড়িয়ে দেয়। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভবিষ্যতে অতিবৃষ্টি ও আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই পানি ব্যবস্থাপনা ও অবকাঠামোগত প্রস্তুতিতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা জরুরি।
ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা
শিশু, বয়স্ক, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, অসুস্থ মানুষ ও গর্ভবতী নারীদের মতো ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য দুর্যোগকালীন বিশেষ প্রস্তুতি থাকা প্রয়োজন। সব এলাকায় সমানভাবে এই ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা এখনো একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
পুনর্বাসনে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা
দুর্যোগের পর শুধু ত্রাণ বিতরণ করলেই সংকটের সমাধান হয় না। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের ঘরবাড়ি পুনর্নির্মাণ, কৃষি পুনরুদ্ধার, যোগাযোগব্যবস্থা সচল করা এবং জীবিকা ফিরিয়ে আনার জন্য সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।
২০২৪ সালের বন্যার অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, দুর্যোগ মোকাবিলায় বাংলাদেশের সক্ষমতা আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। সরকারি সংস্থা, সশস্ত্র বাহিনী, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও সাধারণ মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগ বহু মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে। তবে বড় ও আকস্মিক দুর্যোগের ক্ষেত্রে এখনো প্রস্তুতির জায়গাগুলো আরও শক্তিশালী করা জরুরি।
নেপালের সাম্প্রতিক বন্যার ভয়াবহতা বাংলাদেশকেও নতুন করে ভাবার সুযোগ করে দিয়েছে। দুর্যোগ ঘটার পর শুধু দ্রুত সাড়া দেওয়াই যথেষ্ট নয়। দুর্যোগের আগেই ঝুঁকি চিহ্নিত করা, আগাম সতর্কতা নিশ্চিত করা, স্থানীয় জনগণকে প্রশিক্ষিত করা এবং প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম প্রস্তুত রাখার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
ভবিষ্যতের কার্যকর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার মূল চাবিকাঠি হতে পারে সমন্বিত প্রস্তুতি, প্রযুক্তিনির্ভর আগাম সতর্কবার্তা, স্থানীয় পর্যায়ের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন পরিকল্পনা।
প্রকৃতির দুর্যোগ পুরোপুরি বন্ধ করা মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। তবে সঠিক পরিকল্পনা, সময়োপযোগী প্রস্তুতি এবং কার্যকর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতি অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব। নেপালের বন্যা তাই বাংলাদেশের জন্য শুধু প্রতিবেশী দেশের একটি দুর্যোগের খবর নয়, বরং ভবিষ্যৎ প্রস্তুতি নিয়ে নতুন করে ভাবার একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তাও।
উপজেলা পরিষদ মার্কেট, তলা, রুম নং-২৩, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৬৩০০।
২০২৬ © দৈনিক অধিকার কতৃক সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত