গাজীপুরের জয়দেবপুরে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পাশের খাল থেকে স্যুটকেস ও প্লাস্টিকের বস্তায় নারীর খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় চাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। তদন্তে উঠে এসেছে, প্রেমের সম্পর্ক ও বিয়ে নিয়ে বিরোধের জেরে ডলি আক্তার (৩০) নামে এক নারীকে তাঁর প্রেমিক মিশন ইসলাম (২২) হত্যা করেন বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
পরে মরদেহ গুম করতে মিশন ও তাঁর মা বানু আক্তার (৪৩) সেটিকে দুই অংশে ভাগ করে খালে ফেলে দেন বলে পিবিআইয়ের তদন্তে জানা গেছে। এ ঘটনায় মিশন ইসলাম, তাঁর মা বানু আক্তার এবং মিশনের বন্ধু মিজানুর রহমান মিল্টনকে (২৪) গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
সোমবার সকালে গাজীপুর পিবিআই কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান পুলিশ সুপার মো. রকিবুল আক্তার।
পিবিআই জানিয়েছে, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের কাছ থেকে ঘটনায় ব্যবহৃত বটি, দা, স্কচটেপের অবশিষ্টাংশ, নিহতের জাতীয় পরিচয়পত্র, মোবাইল ফোন ও জুতা উদ্ধার করা হয়েছে।
খাল থেকে মরদেহ উদ্ধারের পর তদন্ত
পিবিআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, নিহত ডলি আক্তার ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা থানার পাহাড়পাবিজান গ্রামের বাদশা মিয়ার মেয়ে। স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদের পর তিনি গাজীপুরের বানিয়ারচালা এলাকায় একটি কারখানায় চাকরি করতেন এবং ওই এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকতেন।
গত শুক্রবার বিকেলে জয়দেবপুর থানার ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পাশের একটি খালে স্যুটকেস ও প্লাস্টিকের বস্তা দেখতে পান স্থানীয়রা। পরে পুলিশ সেখানে গিয়ে সেগুলো থেকে এক নারীর মরদেহ উদ্ধার করে।
ঘটনার পর নিহতের বড় ভাই সোহেল বাদী হয়ে জয়দেবপুর থানায় মামলা করেন। মরদেহের পরিচয় শনাক্ত এবং ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনে ছায়া তদন্ত শুরু করে পিবিআই।
তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় তিনজন গ্রেপ্তার
তদন্তের একপর্যায়ে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় শনিবার রাতে গাজীপুর মহানগরের বাহাদুরপুর তুলসীভিটা এলাকার পৃথক ভাড়া বাসা থেকে মিজানুর রহমান মিল্টন, মিশন ইসলাম ও বানু আক্তারকে গ্রেপ্তার করা হয়।
গাজীপুর পিবিআইয়ের পরিদর্শক মোস্তাফিজুর রহমান আনসারী জানান, ডলি ও মিশন একই কারখানায় কাজ করার সুবাদে তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক তৈরি হয়।
তদন্তে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ৮ সেপ্টেম্বর রাতে ডলি মিশনের ভাড়া বাসায় যান। সেখানে মিশন, তাঁর মা বানু এবং ডলি একসঙ্গে খাবার খান। পরে মিশন ও ডলি একটি কক্ষে এবং বানু পাশের কক্ষে ঘুমাতে যান।
বিয়ে নিয়ে বিরোধের পর হত্যার অভিযোগ
পিবিআই জানায়, বিয়ে ও অতীতের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মিশন ও ডলির মধ্যে কথা-কাটাকাটি ও বিরোধের সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে মিশন তাকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
পিবিআইয়ের ভাষ্য, ঘুম ও অ্যালার্জির ওষুধ খাওয়ার পর ডলি ঘুমিয়ে পড়লে রাত ২টার দিকে মিশন তাঁর গলায় লুঙ্গি পেঁচিয়ে এবং মুখে বালিশ চেপে শ্বাসরোধ করেন। এরপর মরদেহ চৌকির নিচে লুকিয়ে রাখেন তিনি।
পরদিন সকালে ঘর পরিষ্কার করার সময় বানু আক্তার চৌকির নিচে মরদেহ দেখতে পান। এরপর মা-ছেলে মিলে মরদেহ গুমের পরিকল্পনা করেন বলে জানিয়েছে পিবিআই।
স্যুটকেসে না ধরায় মরদেহ দুই অংশ করার দাবি
পিবিআইয়ের তদন্ত অনুযায়ী, মা-ছেলে বাজার থেকে একটি স্যুটকেস কিনে আনেন। তবে সেটিতে মরদেহ রাখা সম্ভব না হওয়ায় বটি, দা ও ব্লেড দিয়ে কোমর থেকে দুই অংশ করা হয় বলে তদন্তে জানা গেছে।
এরপর এক অংশ স্যুটকেসে এবং অন্য অংশ পলিথিনে মুড়িয়ে প্লাস্টিকের বস্তায় রাখা হয়। পরে ভবানীপুর ব্রিজ এলাকার খালের পানিতে সেগুলো ফেলে দেওয়া হয় বলে পিবিআই জানিয়েছে।
পরিচয় শনাক্তে প্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্য
পুলিশ সুপার মো. রকিবুল আক্তার বলেন, মরদেহ পচে যাওয়ায় শুরুতে নিহতের পরিচয় শনাক্ত করা কঠিন ছিল। পরে ক্রাইমসিন বিশ্লেষণ, তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার এবং গোয়েন্দা তথ্যের মাধ্যমে ডলি আক্তারের পরিচয় শনাক্ত করা হয়।
গ্রেপ্তার তিনজনই ঘটনার দায় স্বীকার করে সোমবার আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন বলেও জানান তিনি।
উপজেলা পরিষদ মার্কেট, তলা, রুম নং-২৩, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৬৩০০।
২০২৬ © দৈনিক অধিকার কতৃক সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত