চাঁপাইনবাবগঞ্জে ডেঙ্গু প্রতিরোধে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে পৌর এলাকায় ৮টি বিশেষ টিম গঠনের সিদ্ধান্ত সময়োপযোগী। এ উদ্যোগের মাধ্যমে শুধু মশক নিধন নয়, এডিস মশার সম্ভাব্য প্রজননস্থল চিহ্নিতকরণ, পরিচ্ছন্নতা, জনসচেতনতা এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক পদক্ষেপকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
বুধবার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত মতবিনিময় সভায় প্রতিটি টিমকে মাঠপর্যায়ে কাজ করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সাংবাদিক, স্কাউটস, রেডক্রিসেন্ট ও পৌরসভার কর্মীদের সম্পৃক্ত করার উদ্যোগটি জনসম্পৃক্ততা বাড়াতে সহায়ক হতে পারে।
তবে ডেঙ্গুর মতো জনস্বাস্থ্যসংক্রান্ত বিষয়ে কোনো উদ্যোগের সফলতা নির্ভর করে তার নিয়মিততা, যথাযথ বাস্তবায়ন এবং নাগরিকদের অংশগ্রহণের ওপর।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে মশক নিধন কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ হলেও একই সঙ্গে এডিস মশার প্রজননস্থল চিহ্নিত ও ধ্বংস করা প্রয়োজন। বাড়ির ছাদ, ফুলের টব, পানির পাত্র, ড্রাম, পুরোনো টায়ার, পরিত্যক্ত সামগ্রী কিংবা নির্মাণাধীন স্থাপনায় পানি জমে থাকলে সেখানে মশার বংশবিস্তারের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তাই কোনো এলাকায় মশক নিধনের ওষুধ প্রয়োগের পাশাপাশি কোথায় পানি জমছে, কেন জমছে এবং কীভাবে তা অপসারণ করা যায়—এসব বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
এ ক্ষেত্রে প্রশাসনের উদ্যোগের সঙ্গে নাগরিক সচেতনতা যুক্ত হওয়া জরুরি। কারণ সরকারি কর্মীদের পক্ষে প্রতিটি বাড়ির প্রতিটি কোণ নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব নয়। নিজ নিজ বাড়ি ও আশপাশ পরিষ্কার রাখার দায়িত্বও নাগরিকদের।
জেলা প্রশাসনের সভায় আইইডিসিআর প্রতিনিধি দলের পরিদর্শন ও পরামর্শের কথা তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে ঘরের ভেতরেও এডিস মশার সম্ভাব্য প্রজননস্থল থাকার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়।
এই তথ্য সাধারণ মানুষের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। অনেক সময় বাড়ির ভেতরের ছোট কোনো পাত্রে কিংবা ছাদে জমে থাকা পানিকে তেমন গুরুত্ব দেওয়া হয় না। অথচ এমন স্থান নিয়মিত পরীক্ষা ও পরিষ্কার রাখা ডেঙ্গু প্রতিরোধের অংশ হতে পারে।
তাই নাগরিকদের প্রতি আমাদের আহ্বান—বাড়ির ভেতর ও বাইরে নিয়মিত নজর দিন। কোথাও পানি জমে থাকলে তা দ্রুত অপসারণ করুন। পানির সংরক্ষণ পাত্র যথাসম্ভব ঢেকে রাখুন এবং পরিত্যক্ত পাত্র বা সামগ্রী সরিয়ে ফেলুন।
৮টি টিম মাঠে নামার উদ্যোগ তখনই কার্যকর হবে, যখন তাদের কার্যক্রম নিয়মিতভাবে পরিচালিত ও তদারক করা হবে।
কোন এলাকায় অভিযান হয়েছে, কী ধরনের প্রজননস্থল পাওয়া গেছে, কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং পরবর্তী সময়ে ওই স্থান আবার পরীক্ষা করা হয়েছে কি না—এসব বিষয় নথিভুক্ত করা হলে কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা সহজ হবে।
একদিন অভিযান চালিয়ে দীর্ঘ সময় বিরতি দেওয়া হলে প্রত্যাশিত ফল পাওয়া কঠিন হতে পারে। তাই প্রয়োজন নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও পুনঃপরিদর্শন।
সভায় প্রয়োজন হলে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় আইন প্রয়োগের প্রয়োজন হতে পারে। তবে যেকোনো প্রশাসনিক বা আইনগত পদক্ষেপ অবশ্যই প্রচলিত আইন, বিধি ও নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে গ্রহণ করা উচিত।
সচেতনতা তৈরির পরও কোনো ক্ষেত্রে আইনগত ব্যবস্থা প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রযোজ্য আইনের আওতায় যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। এতে একদিকে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে নাগরিকের আইনগত অধিকারও সুরক্ষিত থাকবে।
অভিযানের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত শাস্তি প্রদানকে কেন্দ্র করে নয়; বরং প্রজননস্থল ধ্বংস, ঝুঁকি কমানো এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে নির্মাণাধীন ভবন, খালি জায়গা, ঝোপঝাড়, ড্রেন ও পরিত্যক্ত স্থানের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা দরকার।
এসব স্থানে পানি জমে থাকলে সংশ্লিষ্ট মালিক, কর্তৃপক্ষ বা দায়িত্বশীল ব্যক্তিকে বিষয়টি অবহিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা যেতে পারে। জনস্বাস্থ্যঝুঁকি থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারে।
তবে প্রতিটি ক্ষেত্রে তথ্য যাচাই, দায়িত্ব নির্ধারণ এবং প্রযোজ্য আইন ও বিধিমালা অনুসরণ করা জরুরি।
ডেঙ্গু প্রতিরোধের দায়িত্ব শুধু প্রশাসন কিংবা পৌরসভার নয়। একজন নাগরিক নিজের বাড়ির আশপাশ পরিষ্কার রাখলে, পানি জমতে না দিলে এবং সম্ভাব্য প্রজননস্থল সম্পর্কে সচেতন থাকলে সামগ্রিক ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করতে পারেন।
‘আমার বাড়ি পরিষ্কার’—এই ধারণার পাশাপাশি আশপাশের পরিবেশের দিকেও নজর দেওয়া দরকার। কারণ জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে একটি এলাকার পরিবেশগত পরিস্থিতি পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত।
তাই স্থানীয় বাসিন্দাদের নিয়ে এলাকাভিত্তিক সচেতনতামূলক কার্যক্রম, পরিচ্ছন্নতা উদ্যোগ এবং স্বেচ্ছাসেবী কমিটি গঠনের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা যেতে পারে।
সভায় মসজিদে ডেঙ্গু প্রতিরোধ বিষয়ে সচেতনতামূলক খুতবার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একইভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন, বাজার কমিটি এবং বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনকে সম্পৃক্ত করা যেতে পারে।
ডেঙ্গু প্রতিরোধের সহজ নিয়মগুলো মানুষের কাছে নিয়মিত পৌঁছে দিতে পারলে সচেতনতা আরও কার্যকর হতে পারে।
বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের মাধ্যমে পরিবার পর্যায়েও সচেতনতার বার্তা পৌঁছানোর সুযোগ রয়েছে।
সভায় উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী ডেঙ্গুর সংক্রমণ শুধু শহরকেন্দ্রিক নয়। গ্রামাঞ্চলেও সংক্রমণের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।
এ কারণে ডেঙ্গু প্রতিরোধ কার্যক্রমকে শুধু পৌর এলাকায় সীমাবদ্ধ না রেখে পর্যায়ক্রমে উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়েও জোরদার করা প্রয়োজন। স্থানীয় প্রশাসন, স্বাস্থ্য বিভাগ, ইউনিয়ন পরিষদ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও জনগণকে সম্পৃক্ত করে এলাকাভিত্তিক উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে সভা হয়েছে, টিম গঠন হয়েছে, মাঠপর্যায়ে কাজের পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। এখন প্রয়োজন এসব সিদ্ধান্তের কার্যকর বাস্তবায়ন।
৮টি টিম নিয়মিত মাঠে কাজ করলে এবং তাদের কার্যক্রম যথাযথভাবে সমন্বয় করা গেলে কোথায় সমস্যা রয়েছে, কোন এলাকায় বেশি নজরদারি প্রয়োজন এবং কোন ধরনের উদ্যোগ কার্যকর হচ্ছে—তা চিহ্নিত করা সম্ভব হবে।
একই সঙ্গে নাগরিকদেরও নিজেদের দায়িত্ব পালনে এগিয়ে আসতে হবে।
ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে লড়াই কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের একার দায়িত্ব নয়। এটি জনস্বাস্থ্য রক্ষার একটি সম্মিলিত প্রচেষ্টা।
প্রশাসনের দায়িত্ব হবে পরিকল্পিত, নিয়মতান্ত্রিক ও ধারাবাহিকভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করা। পৌরসভার দায়িত্ব হবে পরিচ্ছন্নতা ও মশক নিধন কার্যক্রম যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা। আর নাগরিকদের দায়িত্ব হবে নিজ নিজ বসতবাড়ি ও আশপাশে পানি জমতে না দেওয়া এবং সম্ভাব্য প্রজননস্থল সম্পর্কে সতর্ক থাকা।
সব পক্ষের সমন্বিত প্রচেষ্টাতেই ডেঙ্গুর ঝুঁকি কমানো সম্ভব।
এডিস মশা নির্মূলের লড়াইয়ে সবচেয়ে প্রয়োজন নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা, প্রজননস্থল ধ্বংস, সচেতনতা এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগ। চাঁপাইনবাবগঞ্জে শুরু হওয়া ৮ টিমের কার্যক্রম তাই যেন সাময়িক অভিযান হয়ে না থাকে—বরং এটি হোক দীর্ঘমেয়াদি ও নিয়মিত জনস্বাস্থ্য কার্যক্রমের একটি অংশ।
উপজেলা পরিষদ মার্কেট, তলা, রুম নং-২৩, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৬৩০০।
২০২৬ © দৈনিক অধিকার কতৃক সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত