১৮৮৩ সালে প্রতিষ্ঠিত ময়মনসিংহ নগরীর রামবাবু রোডের ঐতিহ্যবাহী সিটি কলেজিয়েট স্কুল দীর্ঘ পথচলায় শিক্ষা ও সংস্কৃতির নানা স্মৃতি বহন করে আসছে। কাইয়ুম চৌধুরী, এটিএম শামসুজ্জামানের মতো কৃতী ব্যক্তিরাও একসময় এই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ছিলেন। তবে ১৪৩ বছরের পুরোনো প্রতিষ্ঠানটিতে বর্তমানে শিক্ষার্থী সংকট দেখা দিয়েছে। একই সঙ্গে বিদ্যালয়ের সম্পত্তিতে থাকা ৮১টি দোকানের ভাড়া এবং প্রায় দুই কোটি টাকার আর্থিক লেনদেন নিয়ে উঠেছে নানা প্রশ্ন।
বিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটিতে ১৫ জন এমপিওভুক্ত শিক্ষক, ছয়জন নিয়মিত কর্মচারী এবং একজন খণ্ডকালীন কর্মচারী কর্মরত রয়েছেন। এর বিপরীতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম হওয়ায় বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষগুলোতে আগের মতো প্রাণচাঞ্চল্য নেই বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
সংশ্লিষ্ট শিক্ষকরা মনে করছেন, সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত এক শিফটে পাঠদান পরিচালিত হওয়ায় শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের একটি অংশ বিদ্যালয়টির প্রতি আগ্রহ হারাচ্ছেন।
তাদের ভাষ্য, নগরীর অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিফট পদ্ধতিতে ক্লাস পরিচালিত হওয়ায় শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার পাশাপাশি অন্যান্য শিক্ষামূলক কার্যক্রমের জন্যও সময় পায়। এ কারণে শিফট ব্যবস্থা চালু হলে সিটি কলেজিয়েট স্কুলেও শিক্ষার্থী সংখ্যা বাড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিদ্যালয়-সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর ২১ জন শিক্ষার্থী ছাড়পত্র (টিসি) নিয়ে অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চলে গেছে। এতে শিক্ষার্থী সংকট আরও দৃশ্যমান হয়েছে।
বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. আবদুল মান্নান বলেন, শিক্ষার্থী সংকট কাটাতে শিফট ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পর্যায়ে উদ্যোগ নেওয়ার পাশাপাশি শিক্ষার্থী বাড়াতে বাড়ি বাড়ি প্রচারণা, অভিভাবক সমাবেশ এবং নিয়মিত পরীক্ষা নেওয়াসহ বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
তার মতে, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো এবং বিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটির প্রতি আগ্রহ পুনরুদ্ধার করা সম্ভব।
বিদ্যালয়ের নিজস্ব সম্পত্তিতে থাকা ৮১টি দোকানের ভাড়ার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, দোকানগুলোর প্রতিটি থেকে বর্তমানে মাত্র ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা করে ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। স্থানীয় বাজারদর ও সম্পত্তির অবস্থান বিবেচনায় এই ভাড়া যথেষ্ট কি না, তা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক জানিয়েছেন, দোকানগুলো পূর্ববর্তী প্রধান শিক্ষকের সময় বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। বর্তমান সময়ে এসব দোকানের ভাড়ার পরিমাণ অপ্রতুল বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
বিদ্যালয়ের সম্পত্তি থেকে যথাযথ আয় নিশ্চিত করা গেলে শিক্ষা কার্যক্রম ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে প্রতিষ্ঠানটি আরও বেশি অর্থ ব্যয় করতে পারবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে বিদ্যালয়ের প্রায় দুই কোটি টাকার আর্থিক লেনদেনে অনিয়মের অভিযোগের কথাও জানিয়েছেন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক। তবে এসব অভিযোগের বিস্তারিত প্রকৃতি, নির্দিষ্ট লেনদেন এবং এর সঙ্গে কারা জড়িত—এ বিষয়ে প্রতিবেদনে স্বাধীনভাবে যাচাই করা কোনো নথি বা নিরীক্ষা প্রতিবেদনের তথ্য পাওয়া যায়নি।
ফলে বিষয়টি সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে আয়-ব্যয়ের হিসাব, সম্পত্তি থেকে প্রাপ্ত অর্থ এবং প্রতিষ্ঠানের অন্যান্য আর্থিক লেনদেন নিয়মিত নিরীক্ষার আওতায় আনার দাবিও উঠেছে।
শিক্ষাবিদ ও সংশ্লিষ্টদের মতে, দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যবাহী একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে টিকিয়ে রাখতে শুধু শিক্ষার্থী ভর্তির সংখ্যা বাড়ালেই হবে না; একই সঙ্গে শিক্ষার পরিবেশ, পাঠদানের মান, অবকাঠামো, সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা এবং আর্থিক স্বচ্ছতার দিকেও গুরুত্ব দিতে হবে।
শিফট ব্যবস্থা চালু, অভিভাবকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ, শিক্ষার্থী আকর্ষণে প্রচার কার্যক্রম, নিয়মিত মূল্যায়ন এবং শিক্ষা পরিবেশ উন্নয়নের পাশাপাশি বিদ্যালয়ের সম্পত্তি ও আর্থিক ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে প্রতিষ্ঠানটি আবারও তার পুরোনো অবস্থান ফিরে পেতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ময়মনসিংহের শিক্ষা অঙ্গনে দীর্ঘদিনের পরিচিত সিটি কলেজিয়েট স্কুলের বর্তমান সংকট কাটিয়ে উঠতে শিক্ষক, অভিভাবক, প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
উপজেলা পরিষদ মার্কেট, (২য় তলা) রুম নং-২৩, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ৬৩০০
২০২৫ © দৈনিক অধিকার কতৃক সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত