সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদে চূড়ান্তভাবে সুপারিশ পাওয়ার পরও যারা নিয়োগপত্র পাননি, তাদের তথ্য নতুন করে যাচাই করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। গতকাল রোববার থেকে বিভিন্ন জেলায় কর্মকর্তাদের মাধ্যমে এসব প্রার্থীর তথ্য পুনর্যাচাই শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে কয়েকটি জেলায় বাদ পড়া প্রার্থীদের দ্বিতীয় দফায় নিয়োগপত্র দেওয়ার প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানিয়েছে, যাচাই-বাছাইয়ের কারণে যেসব সুপারিশপ্রাপ্ত প্রার্থীর নিয়োগপত্র আটকে আছে, প্রয়োজনে তাদের তথ্য নতুন কর্মকর্তাদের মাধ্যমে আবার যাচাই করা হবে। যাচাই শেষে প্রতিবেদন সন্তোষজনক হলে পর্যায়ক্রমে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীদের নিয়োগপত্র দেওয়া হবে।
এদিকে নিয়োগপত্র না পাওয়ায় রোববার রাজধানীর শাহবাগে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন কয়েকশ চাকরিপ্রার্থী। সকাল ১১টা থেকে শাহবাগ থানার সামনে জাতীয় জাদুঘর-সংলগ্ন এলাকায় ‘সারা বাংলাদেশের নিয়োগপত্র বঞ্চিত শিক্ষকবৃন্দ’ ব্যানারে তারা অবস্থান নেন। বিভিন্ন জেলা থেকে দ্বিতীয় দফায় নিয়োগপত্র দেওয়ার খবর আসতে থাকায় সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার পর আন্দোলনকারীদের অনেকে সেখান থেকে চলে যান।
আন্দোলনকারীরা জানিয়েছেন, সোমবার সকালেও তারা শাহবাগে জড়ো হয়ে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করবেন। সব প্রার্থীর নিয়োগপত্র প্রকাশ করা হলে কর্মসূচি শেষ করার কথা জানিয়েছেন তারা।
ভোলা থেকে আসা চাকরিপ্রার্থী শাখাওয়াত হোসেন বলেন, বাদ পড়া প্রার্থীদের নাম ধাপে ধাপে প্রকাশ করা হচ্ছে—এমন খবর পেয়ে তারা কিছুটা আশ্বস্ত হয়েছেন।
সচিবালয়ে গিয়ে সাক্ষাৎ পাননি প্রতিনিধিরা
শাহবাগে অবস্থানের সময় আন্দোলনকারীদের পাঁচ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল সচিবালয়ে যায়। প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী এবং মন্ত্রণালয়ের সচিবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাদের দাবিগুলো তুলে ধরার চেষ্টা করেন তারা। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সাক্ষাৎ না পেয়ে বিকেল ৩টার পর প্রতিনিধি দলের সদস্যরা শাহবাগে ফিরে আসেন।
কয়েকটি জেলায় দ্বিতীয় দফায় নিয়োগপত্র
ইতোমধ্যে কয়েকটি জেলায় দ্বিতীয় দফায় নিয়োগপত্র দেওয়ার কাজ শুরু হয়েছে। রাজশাহীতে রোববার আরও ২২ জনকে নিয়োগপত্র দেওয়া হয়েছে। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার স্বাক্ষর করা বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে তাদের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের রাজস্ব খাতভুক্ত সহকারী শিক্ষক পদে নিয়োগ দেওয়া হয়।
এর আগে প্রথম দফায় রাজশাহীতে ১৩৯ জনকে নিয়োগপত্র দেওয়া হয়েছিল। দ্বিতীয় দফার ২২ জনসহ জেলায় মোট ১৬১ জন নিয়োগপত্র পেয়েছেন।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের রংপুর বিভাগীয় উপপরিচালক মো. আজিজুর রহমান জানিয়েছেন, সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী নিয়োগপত্র দেওয়ার কার্যক্রম চলছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
কীভাবে শুরু হয়েছিল নিয়োগ প্রক্রিয়া
গত বছরের শেষ দিকে পার্বত্য তিন জেলা বাদে দেশের ৬১ জেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়। দুই ধাপে মোট ১৪ হাজার ৩৮৫টি শূন্য পদে নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হয়।
গত ৯ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত লিখিত পরীক্ষায় অংশ নেন ৮ লাখ ৩০ হাজার ৮৮ জন প্রার্থী। ২১ জানুয়ারি প্রকাশিত ফলাফলে ৬৯ হাজার ২৬৫ জন মৌখিক পরীক্ষার জন্য নির্বাচিত হন। এরপর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়ের মাধ্যমে মৌখিক পরীক্ষা নেওয়া হয়।
৮ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত চূড়ান্ত ফলে ১৪ হাজার ৩৮৪ জনকে সহকারী শিক্ষক পদে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করা হয়। প্রায় আট মাস পর ২৪ সেপ্টেম্বর বিভিন্ন জেলায় তাদের নিয়োগপত্র দেওয়া শুরু হয়।
তবে নিয়োগপত্র বিতরণ শুরু হওয়ার পর চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েও অনেক প্রার্থী নিয়োগপত্র না পাওয়ার বিষয়টি সামনে আসে। আন্দোলনকারীদের দাবি, ৪১ জেলায় সহস্রাধিক প্রার্থী এভাবে নিয়োগ থেকে বাদ পড়েছেন। তাদের একটি প্ল্যাটফর্মের হিসাবে এ সংখ্যা প্রায় দুই হাজার। বিভিন্ন সূত্রের হিসাবে ৬১ জেলায় এ সংখ্যা আড়াই হাজারেরও বেশি।
বিভিন্ন জেলায় বাদ পড়াদের পরিস্থিতি
খুলনা: নেতিবাচক পুলিশ প্রতিবেদনের কারণে চূড়ান্ত নিয়োগ থেকে ৬৯ জন বাদ পড়েছিলেন। এর মধ্যে ৬৭ জনকে নিয়োগপত্র দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শেখ অহিদুল আলম।
রাজশাহী: প্রথম দফায় ১৩৯ জন এবং দ্বিতীয় দফায় আরও ২২ জনসহ মোট ১৬১ জন নিয়োগপত্র পেয়েছেন।
গাইবান্ধা: ৪১ জন নিয়োগবঞ্চিত প্রার্থী জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি দিয়েছেন। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয় জানিয়েছে, ৪৫৬ জন সুপারিশপ্রাপ্ত প্রার্থীর মধ্যে ৮ জন প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেননি এবং ৪১ জনের পুলিশ ভেরিফিকেশন সন্তোষজনক হয়নি।
বরিশাল: ৭২ জন চূড়ান্ত সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েও নিয়োগপত্র পাননি। বিষয়টি সমাধানের দাবিতে তারা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে স্মারকলিপি দিয়েছেন।
মানিকগঞ্জ: ২২ জন নিয়োগপত্র না পাওয়ায় দ্রুত নিয়োগের দাবিতে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের মাধ্যমে আবেদন করেছেন।
চট্টগ্রাম: ৪৮ জন চূড়ান্ত সুপারিশ পেয়েও নিয়োগপত্র পাননি। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয় জানিয়েছে, দুটি গোয়েন্দা সংস্থার নেতিবাচক প্রতিবেদনের ভিত্তিতে তাদের নিয়োগপত্র দেওয়া হয়নি।
বগুড়া: ৩০৭ জন সুপারিশপ্রাপ্ত হলেও ২৯৬ জন প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেন। শেষ পর্যন্ত ২৪৮ জন নিয়োগপত্র পেয়েছেন। বাদ পড়া ৪৮ জনের বিষয়ে জরুরি সভা হয়েছে এবং তাদের মধ্যে আরও কয়েকজনকে নিয়োগ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
সিরাজগঞ্জ: তিনজন প্রার্থী নিয়োগপত্র পাননি। পুলিশ ভেরিফিকেশন ও প্রশাসনিক যাচাইয়ে নেতিবাচক প্রতিবেদন আসার পর তাদের নিয়োগপত্র দেওয়া হয়নি।
ঠাকুরগাঁও: ৫০ জন প্রার্থী নিয়োগপত্র পাননি। তাদের বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়।
কুমিল্লা: ৫০৮ জনকে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করা হলেও ৪৭৭ জন প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেন। এর মধ্যে পুলিশ প্রতিবেদনসহ বিভিন্ন কারণে ৭৭ জন নিয়োগপত্র পাননি।
পটুয়াখালী: ২০ জন প্রার্থী নিয়োগপত্র পাননি। তবে তাদের বাদ পড়ার কারণ জানায়নি জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়।
রাজবাড়ী: ৮৪ জন সুপারিশপ্রাপ্ত প্রার্থীর মধ্যে ৬ জন প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেননি। বাকি ৭৮ জনের মধ্যে ৬৮ জনের নিয়োগের আদেশ হলেও ১০ জন এখনো নিয়োগপত্র পাননি।
পুনর্যাচাই ও নিয়োগের দাবি
নিয়োগপত্র না পাওয়া প্রার্থীদের পক্ষ থেকে বাদ দেওয়ার কারণ প্রকাশ, তথ্য পুনর্যাচাই, প্রশাসনিক ভুল সংশোধনের সুযোগ এবং যোগ্য প্রার্থীদের দ্রুত নিয়োগপত্র দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।
সরকারের নতুন উদ্যোগে এখন পুনর্যাচাইয়ের মাধ্যমে যেসব প্রার্থীর তথ্য ও যাচাই প্রতিবেদন ইতিবাচক পাওয়া যাবে, তাদের ধাপে ধাপে নিয়োগপত্র দেওয়ার কথা রয়েছে
উপজেলা পরিষদ মার্কেট, (২য় তলা) রুম নং-২৩, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ৬৩০০
২০২৫ © দৈনিক অধিকার কতৃক সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত