কুড়িগ্রামের চিলমারীতে অসময়ে ব্রহ্মপুত্র নদের তীব্র স্রোতে তীররক্ষা বাঁধে একের পর এক ধস দেখা দিয়েছে। কাঁচকোল বাজার থেকে পুঁটিমারী পর্যন্ত প্রায় ৬০০ মিটার এলাকায় নদীর স্রোত বাঁধ ঘেঁষে প্রবাহিত হওয়ায় ঝুঁকিতে পড়েছে বসতবাড়ি, আবাদি জমি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন স্থাপনা।
স্থানীয় সূত্র ও পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জানায়, এরই মধ্যে চার দফায় বাঁধের প্রায় ২০০ মিটার অংশে ধস নেমেছে। ফলে বাঁধটি আরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে বড় ধরনের ভাঙনের মুখে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে নদীতীরবর্তী মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ও আতঙ্ক দেখা দিয়েছে।
পাউবো সূত্রে জানা গেছে, গত জুলাই থেকেই ওই এলাকায় বাঁধের কাছাকাছি ব্রহ্মপুত্রের স্রোত তীব্র হয়ে ওঠে। জুলাই মাসে কাঁচকোল বাজারের উত্তরে সড়কটারি এলাকায় প্রায় ১২০ মিটার অংশে ধস নামে। তখন থেকেই বাঁধের স্থায়িত্ব নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়।
ভাঙন ঠেকাতে পাউবো জিও ব্যাগ ফেলে বাঁধ রক্ষার চেষ্টা করলেও নদীর তলদেশের গভীরতার কারণে তা প্রত্যাশিত ফল দেয়নি বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। গত তিন সপ্তাহে কাঁচকোল বাজারসংলগ্ন দুটি স্থান এবং কেডি ওয়ারি স্কুলের পাশের ক্রসবাঁধের মাথায় প্রায় ৮০ মিটার অংশে কংক্রিটের ব্লক ধসে পড়েছে।
কাঁচকোল গ্রামের বাসিন্দা ও অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গোলাম ফারুক বলেন, বাঁধের পূর্বদিকে ভট্রিভিটা ও চর বড়ভিটা এলাকায় নতুন চর জেগে উঠেছে। এতে ব্রহ্মপুত্রের মূল স্রোতের বড় অংশ বাঁধের কাছ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ঘূর্ণিস্রোতের কারণে নদীর গভীরতা বাড়ার পাশাপাশি বাঁধের ব্লকও ধসে পড়ছে।
তিনি আরও বলেন, অসময়ে নদীর পানি বাড়ায় বাঁধের ঝুঁকি বেড়েছে। বাঁধটি ক্ষতিগ্রস্ত হলে ১১টি গ্রামের প্রায় এক হাজার পরিবার সমস্যায় পড়তে পারে। একই সঙ্গে দুটি বিলের শত শত একর কৃষিজমিতে বালু জমে ফসলের ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। ঝুঁকিতে রয়েছে তিনটি বিদ্যালয়, একটি মাদরাসা ও একটি বাজার। বাঁধটি বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়লে চিলমারী উপজেলা সদরেও পানি প্রবেশের আশঙ্কা রয়েছে।
বাঁধের পাশে বসবাসকারী বৃদ্ধ আব্দুল খালেক বলেন, বাঁধ ভেঙে গেলে তাঁদের ঘরবাড়ি ও সম্পদ হারানোর আশঙ্কা রয়েছে। এ চিন্তায় তাঁরা রাতে স্বস্তিতে ঘুমাতেও পারছেন না।
সড়কটারি গ্রামের বাসিন্দা বাছিরন বেগম ইতোমধ্যে চারবার নদীভাঙনের শিকার হয়েছেন। বর্তমানে বাঁধের নিচে বসবাস করলেও তাঁর বাড়ির পাশেই নতুন করে বড় অংশে ধস দেখা দেওয়ায় তিনি উদ্বিগ্ন।
কেডি ওয়ারি ক্রসবাঁধের ধসপ্রবণ অংশের পাশে বসবাস করেন বিধবা শেফালি বেগম। জমিজমা না থাকায় নদীর তীরেই বসতি গড়েছেন তিনি। প্রতিবছর বন্যার পানিতে ভোগান্তিতে পড়লেও এবার বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হলে আশ্রয় হারানোর আশঙ্কা করছেন।
স্থানীয়দের দাবি, শেফালি বেগমের মতো আরও প্রায় ৩০০ পরিবার বাঁধের দুই পাশে বসবাস করছে। বাঁধ ভেঙে গেলে এসব পরিবারের নিরাপদ আশ্রয় ও জীবনযাপন নিয়ে বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে।
এলাকাবাসীর ভাষ্য, ২০১৮ সালে প্রায় ৪৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে ব্রহ্মপুত্রের ডান তীর রক্ষা প্রকল্পের আওতায় কংক্রিটের ব্লক দিয়ে বাঁধের পিচিং করা হয়েছিল। এতে তখন ভাঙন নিয়ন্ত্রণে এলেও দীর্ঘদিন সংস্কার ও প্রয়োজনীয় খনন না হওয়ায় বর্তমানে বাঁধটি আবারও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে।
তাদের দাবি, নদীতে জেগে ওঠা চরগুলোর আশপাশে ড্রেজিং করে স্রোতের গতিপথ পরিবর্তন করা গেলে বাঁধের ওপর চাপ কমানো সম্ভব। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে চলতি সময়ে কোনোভাবে বাঁধ রক্ষা করা গেলেও পরবর্তী বর্ষা মৌসুমে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
স্থানীয় বাসিন্দা রায়হান মিয়া বলেন, নদী খনন করে বাঁধ রক্ষার জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সরকারি কর্মকর্তাদের কাছে দাবি জানানো হলেও এখন পর্যন্ত প্রত্যাশিত কার্যক্রম দেখা যায়নি।
চিলমারী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান বলেন, কাঁচকোল এলাকায় নদীর কোনো কোনো স্থানে গভীরতা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৫ মিটারেরও বেশি। বাঁধের একেবারে কাছ দিয়ে এমন গভীর স্রোত প্রবাহিত হওয়ায় বারবার ধস দেখা দিচ্ছে।
তিনি জানান, বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ কয়েকটি এলাকায় জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ফেলা হচ্ছে। পাশাপাশি জরুরি ব্যবস্থার জন্য ৬ হাজার জিও ব্যাগের বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে।
নির্বাহী প্রকৌশলী আরও জানান, বাঁধটি স্থায়ীভাবে সংস্কার ও সুরক্ষিত করার লক্ষ্যে ডিপিপি বা প্রকল্প প্রস্তাব জমা দেওয়া হয়েছে। অনুমোদন পাওয়া গেলে শুষ্ক মৌসুমে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
উপজেলা পরিষদ মার্কেট, (২য় তলা) রুম নং-২৩, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ৬৩০০
২০২৫ © দৈনিক অধিকার কতৃক সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত