প্রিলিমিনারি, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা—বিসিএসের প্রতিটি ধাপ পেরিয়ে বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) সুপারিশ পেয়েছিলেন তারা। কেউ কেউ নিজ নিজ বিষয়ে ছিলেন মেধাতালিকার শীর্ষে। এরপরও ৪৯তম বিসিএসের (বিশেষ) চূড়ান্ত গেজেটে জায়গা হয়নি ৫৭ প্রার্থীর।
পিএসসি ৪৯তম বিসিএসে শিক্ষা ক্যাডারে মোট ৬৬৮ জনকে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করেছিল। তবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় বুধবার যে প্রজ্ঞাপন প্রকাশ করেছে, সেখানে নিয়োগ পেয়েছেন ৬১১ জন। অর্থাৎ পিএসসির সুপারিশের পরও ৫৭ জন প্রার্থী চূড়ান্ত নিয়োগ থেকে বাদ পড়েছেন।
নিয়োগবঞ্চিত প্রার্থীদের অভিযোগ, তাদের অনেকেই গোয়েন্দা সংস্থার যাচাই-বাছাই বা ভেরিফিকেশনের কারণে বাদ পড়েছেন। তবে কেন তাদের নিয়োগ দেওয়া হয়নি, সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো কারণ জানানো হয়নি বলেও দাবি করেছেন তারা। ফলে দীর্ঘ প্রস্তুতি ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার সব ধাপ সফলভাবে শেষ করার পর শেষ পর্যায়ে এসে নিয়োগ না পাওয়ায় হতাশা তৈরি হয়েছে প্রার্থীদের মধ্যে।
৩. মেধাতালিকায় প্রথম হয়েও গেজেটে নেই নাম
৪৯তম বিসিএসে ইতিহাস বিষয়ে মেধাক্রমে প্রথম হয়েছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মো. সোহেল রানা। পিএসসির সুপারিশ পাওয়ার পর চূড়ান্ত গেজেটে নিজের নাম না থাকায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন তিনি।
সমাজকল্যাণ বিষয়ে মেধাতালিকায় প্রথম হয়েও নিয়োগ না পাওয়ার কথা জানিয়েছেন আব্দুল্লাহ আল মামুন। তাঁর দাবি, জুলাইয়ের আন্দোলনে সক্রিয় থাকার কারণে তাকে নিয়োগ থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।
ইংরেজি বিষয়ে মেধাক্রমে ১৪তম ছিলেন বুশরা জাহান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি জানান, গেজেটে ১৩ ও ১৫তম মেধাক্রমের প্রার্থীদের নাম থাকলেও তার নাম নেই। কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত না থাকার পরও কেন তিনি নিয়োগবঞ্চিত হয়েছেন, সে প্রশ্নও তুলেছেন তিনি।
আরেক প্রার্থী রেদওয়ান আহমেদ তাহমিদ জানিয়েছেন, দীর্ঘদিনের প্রস্তুতি ও পরিশ্রমের পর ৪৯তম বিসিএসে সুপারিশ পেয়েও শেষ মুহূর্তে গেজেট থেকে বাদ পড়েছেন তিনি।
৪. ভেরিফিকেশন নিয়ে আবারও প্রশ্ন
বিসিএসে সুপারিশ পাওয়ার পর চূড়ান্ত নিয়োগের আগে পুলিশ ভেরিফিকেশনের প্রচলিত ব্যবস্থা নিয়ে আগেও প্রশ্ন উঠেছে। জনপ্রশাসনে নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে গঠিত সংস্কার কমিশন এ বিষয়ে ভিন্ন পদ্ধতি অনুসরণের সুপারিশ করেছিল।
কমিশনের প্রতিবেদনের ৯.২ অনুচ্ছেদে বিসিএসে উত্তীর্ণ প্রার্থীর বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি মামলা রয়েছে কি না, মূলত সে বিষয়ে পুলিশের কাছ থেকে তথ্য নেওয়ার প্রস্তাব করা হয়। প্রয়োজন হলে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) থেকেও তথ্য নেওয়ার কথা বলা হয়েছিল।
এ ছাড়া পদোন্নতির ক্ষেত্রে পুলিশ বা গোয়েন্দা সংস্থার কাছে কোনো কর্মকর্তার রাজনৈতিক পরিচয় জানতে চাওয়ার প্রচলন বাতিলের সুপারিশ করেছিল সংস্কার কমিশন। তাদের যুক্তি ছিল, এ ধরনের প্রক্রিয়া প্রশাসনে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি করতে পারে।
বিদ্যমান বিসিএস নিয়োগ বিধিমালা, ১৯৮১ অনুযায়ী নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যগত অযোগ্যতা বা অপরাধসংক্রান্ত বিষয় বিবেচনার সুযোগ থাকলেও শুধু রাজনৈতিক পরিচয় বা রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার কারণে কাউকে নিয়োগ থেকে বাদ দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে।
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ফিরোজ মিয়া বলেন, কোনো প্রার্থীর বিরুদ্ধে ফৌজদারি অপরাধের অভিযোগ না থাকলে শুধু পুলিশ বা গোয়েন্দা প্রতিবেদনের ভিত্তিতে তাকে নিয়োগ থেকে বঞ্চিত করার সুযোগ থাকা উচিত নয়।
৫. আগেও উঠেছিল নিয়োগবঞ্চিত হওয়ার অভিযোগ
সম্প্রতি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগেও চূড়ান্তভাবে উত্তীর্ণ হওয়ার পর বিপুলসংখ্যক প্রার্থী নিয়োগপত্র না পাওয়ার অভিযোগ করেছিলেন। পরে আন্দোলনের পর তাদের অনেককে পর্যায়ক্রমে নিয়োগ দেওয়া হয়।
এ ছাড়া আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ৩৮তম থেকে ৪২তম বিসিএস পর্যন্ত অন্তত ২৩৯ প্রার্থীকে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করেছিল পিএসসি। তবে তারা সে সময় নিয়োগ পাননি। পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে তাদের নিয়োগ দেওয়া হয়।
সাধারণত বিসিএসের চূড়ান্ত ফল প্রকাশের পর প্রার্থীদের পরিবারে স্বস্তি ও আনন্দ আসে। দীর্ঘদিনের প্রস্তুতি, পরীক্ষা ও অপেক্ষার পর কাঙ্ক্ষিত চাকরির সুযোগ তৈরি হয়। কিন্তু ৪৯তম বিসিএসের ৫৭ প্রার্থীর ক্ষেত্রে পিএসসির সুপারিশের পরও গেজেটে নাম না থাকায় সেই প্রত্যাশা এখন অনিশ্চয়তায় পড়েছে।
নিয়োগবঞ্চিত কয়েকজন প্রার্থীর প্রশ্ন—কোন অভিযোগের ভিত্তিতে তাদের বাদ দেওয়া হয়েছে, কার প্রতিবেদনের ওপর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং ওই প্রতিবেদনের বিষয়ে তাদের বক্তব্য জানানোর সুযোগ দেওয়া হবে কি না।
উপজেলা পরিষদ মার্কেট, (২য় তলা) রুম নং-২৩, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ৬৩০০
২০২৫ © দৈনিক অধিকার কতৃক সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত