দেশে উচ্চশিক্ষার পরিসর ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে। প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক তরুণ-তরুণী বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ থেকে বিভিন্ন বিষয়ে ডিগ্রি নিয়ে বের হচ্ছেন। সনদের সংখ্যা যেমন বাড়ছে, তেমনি বাড়ছে শিক্ষিত মানুষের সংখ্যাও। কিন্তু এর পাশাপাশি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও জোরালো হয়ে উঠছে—ডিগ্রির সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রকৃত দক্ষতা কতটা বাড়ছে?
একজন তরুণ স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়ে কর্মজীবনে পা রাখতে গিয়ে প্রায়ই উপলব্ধি করেন, তার একাডেমিক জ্ঞান আর কর্মক্ষেত্রের বাস্তব চাহিদার মধ্যে বিস্তর ফারাক রয়ে গেছে। এই ফাঁক শুধু ব্যক্তিগত সমস্যা নয়, বরং এটি পুরো শিক্ষাব্যবস্থার একটি কাঠামোগত দুর্বলতা। নিয়োগদাতারা ভালো ফলাফলের পাশাপাশি যোগাযোগ দক্ষতা, ইংরেজি-বাংলায় কার্যকর লেখার সক্ষমতা, কম্পিউটার ও ডিজিটাল প্রযুক্তিতে দক্ষতা, সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা, বিশ্লেষণী চিন্তা, দলগত কাজ এবং বাস্তব অভিজ্ঞতা খুঁজে থাকেন। কিন্তু এসব দক্ষতা অর্জনের পর্যাপ্ত সুযোগ এখনো আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় তৈরি হয়নি।
এর মূল কারণ শিক্ষা ও বাস্তবতার মধ্যকার দূরত্ব। পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়ার জন্য মুখস্থনির্ভর প্রস্তুতি শিক্ষার্থীকে প্রশ্নের উত্তর লিখতে শেখায় ঠিকই, কিন্তু বাস্তব জীবনের সমস্যা সমাধানের দক্ষতা তৈরি করে না। শ্রেণিকক্ষে কোনো বিষয়ের সংজ্ঞা জানা আর সেই জ্ঞান বাস্তবে প্রয়োগ করতে পারা—এ দুটি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। অথচ কর্মক্ষেত্রে দ্বিতীয়টির চাহিদাই বেশি।
উচ্চশিক্ষার অন্যতম মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত জ্ঞানকে বাস্তব কাজে রূপান্তরের সক্ষমতা তৈরি করা। কিন্তু বাস্তবে অনেক শিক্ষার্থীর বিশ্ববিদ্যালয়জীবন কেটে যায় মূলত পরীক্ষা, অ্যাসাইনমেন্ট আর ফলাফলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে। গবেষণা, প্রকল্পভিত্তিক কাজ, মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংযোগ কিংবা বাস্তব সমস্যা নিয়ে কাজ করার সুযোগ এখনো সীমিত। ফলে হাতে সনদ এলেও কর্মজীবনে প্রবেশের প্রস্তুতি থেকে যায় অসম্পূর্ণ।
এই ব্যবধান সবচেয়ে স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে নিয়োগপ্রক্রিয়ায়। সমান শিক্ষাগত যোগ্যতার অসংখ্য প্রার্থী একই চাকরির জন্য প্রতিযোগিতা করছেন, যেখানে শুধু ডিগ্রি আলাদা কোনো বাড়তি সুবিধা দিচ্ছে না। একজন প্রার্থী কী জানেন তার চেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে উঠছে—তিনি কী করতে পারেন। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদ ও বাস্তব কর্মদক্ষতার মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করা এখন সময়ের জরুরি দাবি।
প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোমেশন ও ডিজিটাল প্রযুক্তি কর্মক্ষেত্রের ধরন প্রতিনিয়ত বদলে দিচ্ছে। আজ যে দক্ষতা মূল্যবান মনে হচ্ছে, কয়েক বছর পর তার চাহিদা কমেও যেতে পারে। তাই শিক্ষার্থীদের শুধু নির্দিষ্ট কিছু তথ্য শেখানো যথেষ্ট নয়; বরং এমন সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে দ্রুত মানিয়ে নিতে ও নতুন কিছু শিখতে পারেন।
এখানে সফট স্কিলের গুরুত্বও অস্বীকার করার উপায় নেই। একজন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় চমৎকার ফল করলেও হয়তো নিজের বক্তব্য স্পষ্টভাবে উপস্থাপন করতে পারেন না, দলনেতৃত্ব দিতে পারেন না, নির্দিষ্ট সময়ে কাজ শেষ করার অভ্যাস নেই কিংবা গঠনমূলক সমালোচনা গ্রহণ করে নিজেকে শুধরে নেওয়ার মানসিকতা তৈরি হয়নি। কর্মক্ষেত্রে এসব ঘাটতি দ্রুতই প্রকাশ পায়। তাই যোগাযোগ, নেতৃত্ব, সৃজনশীলতা, সময় ব্যবস্থাপনা, দলগত কাজ ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতাকে শিক্ষার আনুষ্ঠানিক অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি।
শুধু বিশ্ববিদ্যালয়কে দায়ী করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। শিক্ষার্থীদেরও বুঝতে হবে, ডিগ্রি কোনো চূড়ান্ত গন্তব্য নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরেও শেখার বিশাল সুযোগ রয়েছে। বই পড়া, লেখালেখি, বিতর্ক, উপস্থাপনা, স্বেচ্ছাসেবা, গবেষণা, নতুন প্রযুক্তি শেখা, প্রকল্পে কাজ করা কিংবা নিজ উদ্যোগে কিছু পরিচালনার অভিজ্ঞতা একজন শিক্ষার্থীর সক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে। চাকরির বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর দক্ষতা অর্জনের চেষ্টা করলে অনেকটা দেরি হয়ে যায়; প্রস্তুতি শুরু করতে হয় শিক্ষাজীবন থেকেই।
ব্যক্তিগত উদ্যোগের পাশাপাশি রাষ্ট্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্বও কম নয়। পাঠ্যক্রমকে সময়োপযোগী করা, ব্যবহারিক শিক্ষার পরিধি বাড়ানো, আধুনিক ল্যাব ও প্রযুক্তিগত সুবিধা নিশ্চিত করা, গবেষণার সুযোগ সম্প্রসারণ এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যকর অংশীদারত্ব গড়ে তোলা এখন জরুরি হয়ে পড়েছে। ইন্টার্নশিপকে নিছক আনুষ্ঠানিকতা থেকে বের করে বাস্তব কাজ শেখার কার্যকর মাধ্যমে পরিণত করতে হবে। শিক্ষার্থীদের প্রকল্পভিত্তিক মূল্যায়ন বাড়াতে হবে, যাতে তারা শুধু মুখস্থ না করে চিন্তা করে, বিশ্লেষণ করে এবং প্রয়োগ করে শিখতে পারেন।
এক্ষেত্রে শিক্ষকদের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষক কেবল পাঠ্যবইয়ের তথ্য সরবরাহকারী—এই ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। শিক্ষার্থীর প্রশ্ন করার সুযোগ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, গবেষণার আগ্রহ এবং বাস্তব সমস্যা নিয়ে ভাবার মতো পরিবেশ তৈরি করা দরকার। কারণ দক্ষতা শুধু বই পড়ে অর্জিত হয় না; তা গড়ে ওঠে অনুশীলন, ভুল থেকে শেখা, সংশোধন ও বাস্তব অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে।
একটি দেশের উচ্চশিক্ষার সাফল্য তাই শুধু কতজন ডিগ্রি অর্জন করলেন, তা দিয়ে বিচার করা উচিত নয়। বরং দেখতে হবে, সেই শিক্ষিত জনগোষ্ঠী কতটা উৎপাদনশীল, কতটা উদ্ভাবনী এবং বাস্তব সমস্যা সমাধানে কতটা সক্ষম। তারা কি নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারছে? গবেষণা ও উদ্ভাবনে অবদান রাখছে? প্রযুক্তিকে উৎপাদনশীল কাজে লাগাতে পারছে? দেশের অর্থনীতিতে নতুন মূল্য যোগ করছে?
ডিগ্রি একজন মানুষের শিক্ষাগত পরিচয় বহন করে, আর দক্ষতা বহন করে তার প্রকৃত সক্ষমতার পরিচয়। সনদ হয়তো চাকরির জন্য আবেদনের সুযোগ করে দেয়, কিন্তু কর্মক্ষেত্রে টিকে থাকা ও এগিয়ে যাওয়ার শক্তি আসে দক্ষতা থেকেই। তাই এখন শুধু শিক্ষিত তরুণ তৈরির লক্ষ্যই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন দক্ষ, অভিযোজনক্ষম এবং সমস্যা সমাধানে পারদর্শী একটি তরুণ প্রজন্ম।
আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার সাফল্যের মাপকাঠি হওয়া উচিত সনদের সংখ্যা নয়, বরং সক্ষমতার গভীরতা। ডিগ্রি বাড়া নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক একটি খবর। কিন্তু সেই ডিগ্রির সঙ্গে যদি প্রকৃত দক্ষতা না বাড়ে, তাহলে শিক্ষার এই বিস্তার কাগজেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে।
উপজেলা পরিষদ মার্কেট, (২য় তলা) রুম নং-২৩, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ৬৩০০
২০২৫ © দৈনিক অধিকার কতৃক সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত