আজকের আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থায় মোবাইল ফোনের একটি ক্লিকেই পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে বার্তা পৌঁছে যায় নিমেষে। মুহূর্তেই ভিডিও কলে যুক্ত হওয়া যায় প্রিয়জনের সঙ্গে। অথচ কয়েক দশক আগেও চিত্রটি ছিল ভিন্ন। একটি চিঠির জন্য মানুষকে দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হতো। পায়ে হেঁটে, ঘোড়ায় চড়ে কিংবা ইঞ্জিনচালিত যানে চড়ে খামে ভরা আবেগ আর খবরাখবর এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পৌঁছাত। সেই চিঠির জন্য মনের ভেতর যে ব্যাকুলতা ও অপেক্ষার শিহরণ কাজ করত, আজকের যান্ত্রিক যুগে তা এখন স্মৃতিমাত্র।
আজকের এই দ্রুতগতির ব্যবস্থার পেছনে রয়েছে সুদীর্ঘ ইতিহাস। ধারণা করা হয়, খ্রিষ্টপূর্ব ৫৫০ অব্দের দিকে পারস্যের সম্রাট সাইরাস দ্য গ্রেট প্রথম সুসংগঠিত ডাক ব্যবস্থা চালু করেন। এর নাম ছিল ‘চাপার খানেহ’। এই ব্যবস্থায় নির্দিষ্ট দূরত্ব পরপর নতুন ঘোড়া ও দক্ষ অশ্বারোহী প্রস্তুত রাখা হতো, যাতে কোনো বিরতি ছাড়াই দ্রুত বার্তা এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে পৌঁছে দেওয়া যায়।
পারস্যের এই ধারণা ধীরে ধীরে ভারতীয় উপমহাদেশেও ছড়িয়ে পড়ে। সুর বংশের শাসক শেরশাহ সুরি মোগলদের পরাজিত করে অল্প সময়ের জন্য দিল্লি শাসন করেন। তিনিই উপমহাদেশে সুসংগঠিত ডাক ব্যবস্থার ভিত্তি স্থাপন করেন। বিখ্যাত গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড নির্মাণের পাশাপাশি ঘোড়ার ডাক ও রিলে পদ্ধতির মাধ্যমে তিনি এই ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক ও গতিশীল করেন।
রিলে পদ্ধতিতে প্রতিটি ডাকচৌকিতে ঘোড়া ও অশ্বারোহী প্রস্তুত রাখা হতো। বার্তাবাহী ঘোড়া নির্দিষ্ট ডাকচৌকিতে পৌঁছালে চিঠির থলে তুলে দেওয়া হতো নতুন ঘোড়া ও অশ্বারোহীর হাতে। এভাবে বিরতিহীনভাবে যোগাযোগ চালু থাকত।
সময়ের বিবর্তনে ডাক ব্যবস্থা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবেই নয়, একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে। বিশ্বজুড়ে ডাক ব্যবস্থাকে আরও দ্রুত ও সমন্বিত করার প্রয়োজনীয়তাও তীব্র হয়ে ওঠে। ১৮৭৪ সালের ৯ অক্টোবর সুইজারল্যান্ডের বার্নে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক ডাক কংগ্রেসে স্বাক্ষরিত হয় ‘বার্ন চুক্তি’। এর মাধ্যমেই জন্ম নেয় বিশ্ব ডাক সংঘ (ইউপিইউ)। পরে ১৯৪৮ সালে এটি জাতিসংঘের একটি বিশেষায়িত সংস্থায় পরিণত হয়। বার্ন চুক্তি স্বাক্ষরের স্মরণে ৯ অক্টোবরকে বিশ্ব ডাক দিবস হিসেবে পালন করা হয়। প্রযুক্তির ভিড়ে ডাকবাক্সের ব্যবহার কমেছে ঠিকই। তবে মানবসভ্যতার পারস্পরিক সংযোগে ডাক ব্যবস্থার অবদান এবং এর রোমাঞ্চকর ইতিহাস চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
উপজেলা পরিষদ মার্কেট, (২য় তলা) রুম নং-২৩, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ৬৩০০
২০২৫ © দৈনিক অধিকার কতৃক সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত