দুর্ভোগ থেকে মুক্তির আশায় নাগরিকেরা সরকারি দপ্তরে অভিযোগ জানান। কেউ রাস্তার খানাখন্দের কথা বলেন, কেউ জলাবদ্ধতার, কেউ অনিয়ম-দুর্নীতি বা সেবাবঞ্চনার প্রতিকার চান। অভিযোগ জমা পড়ে, গ্রহণের সিল লাগে, নথিতে নম্বর ওঠে। কিন্তু সমস্যার সমাধান কতটা এগোল, সেই উত্তর অনেক সময় মেলে না। যে অভিযোগ ভোগান্তি কমানোর কথা, তা-ই কখনো দপ্তরের ফাইলে চাপা পড়ে থাকে। তখন প্রশ্ন ওঠে, অভিযোগ গ্রহণই কি প্রশাসনের দায়িত্বের শেষ, নাকি প্রতিকার নিশ্চিত করাও তার বাধ্যবাধকতা?
নাগরিক সেবা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা রয়েছে। আছে অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থা (জিআরএস), গণশুনানি, হটলাইন ও লিখিত আবেদনের সুযোগ। এসব উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ। তবে অভিযোগ জানানোর সুযোগ আর কার্যকর প্রতিকার এক জিনিস নয়। নাগরিকের দরকার অভিযোগ জমা দেওয়ার প্রমাণ নয়, সমস্যার সমাধান। অথচ অভিযোগের পর কী হলো, কে দায়িত্ব নিলেন, কত দিনে নিষ্পত্তি হবে, এসব বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য না পেলে অভিযোগকারী অনিশ্চয়তায় থেকে যান।
ধরা যাক, কোনো এলাকার সড়কে দীর্ঘদিন ধরে গর্ত। বাসিন্দারা সংশ্লিষ্ট দপ্তরে অভিযোগ করলেন। দপ্তর অভিযোগ নিল, আশ্বাসও দিল। কিন্তু সপ্তাহ পেরিয়ে মাস গেলেও সংস্কারের উদ্যোগ দেখা গেল না। বৃষ্টিতে গর্তে পানি জমল, যান চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হলো, দুর্ঘটনার আশঙ্কা বাড়ল। অভিযোগের নথি তখন নাগরিকের নিরাপত্তা দিতে পারল না। ময়লা অপসারণ, নালা পরিষ্কার, রাস্তার বাতি মেরামত কিংবা নাগরিক সনদ পেতে হয়রানির ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যায়। কাগজে অভিযোগ নিষ্পত্তি হলেও বাস্তবে সমস্যা থেকে যেতে পারে।
এ ব্যবস্থার দুর্বলতার পেছনে কয়েকটি কারণ আছে।
প্রথমত, অভিযোগ গ্রহণ ও নিষ্পত্তির মধ্যে কার্যকর তদারকির ঘাটতি। দ্বিতীয়ত, নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার জবাবদিহি নিশ্চিত করার দুর্বলতা। তৃতীয়ত, অভিযোগকারীকে অগ্রগতি জানানোর অনীহা বা অপর্যাপ্ত ব্যবস্থা। চতুর্থত, এক দপ্তরের দায় অন্য দপ্তরের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতা। একটি অভিযোগ একাধিক সংস্থার সঙ্গে জড়িত হলে সমন্বয়ের অভাবে নাগরিককে এক অফিস থেকে আরেক অফিসে ঘুরতে হয়। অথচ নাগরিকের কাছে প্রশাসনের কাঠামো নয়, প্রয়োজনীয় সেবাটিই আসল।
অভিযোগের দীর্ঘসূত্রতা মানুষকে হতাশ করে। কেউ বারবার দপ্তরে যাওয়ার সময় পান না, কেউ যাতায়াতের খরচ জোগাতে পারেন না, আবার কেউ প্রভাবশালীর বিরাগভাজন হওয়ার ভয়ে অভিযোগই করতে সাহস পান না। নিম্ন আয়ের মানুষ, প্রবীণ, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য এ ভোগান্তি আরও কঠিন। অভিযোগের পদ্ধতি জটিল হলে কিংবা অনলাইনে আবেদনের পরও সরাসরি যোগাযোগ করতে হলে সেবাপ্রাপ্তিতে বৈষম্য বাড়ে। তাই অভিযোগ প্রতিকারের ব্যবস্থা শুধু কাগজে থাকলে চলবে না; তা হতে হবে সহজলভ্য, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও কার্যকর।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো অভিযোগ নিষ্পত্তি আর অভিযোগকারীর সন্তুষ্টিকে এক করে দেখা। কর্মকর্তা একটি জবাব পাঠালেই সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে, এমন ধারণা গ্রহণযোগ্য নয়। সাফল্যের মাপকাঠি জবাবের ভাষা নয়, প্রতিকারের বাস্তব ফল। রাস্তা মেরামতের অভিযোগে দরকার পরিদর্শন প্রতিবেদন নয়, নিরাপদ রাস্তা। বর্জ্যের অভিযোগে দরকার আশ্বাস নয়, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ। অনিয়মের অভিযোগে শুধু ব্যাখ্যা চাইলে হবে না; দরকার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং প্রমাণিত হলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা।
এ পরিস্থিতি বদলাতে প্রথমেই প্রতিটি অভিযোগের জন্য আলাদা ট্র্যাকিং নম্বর দিতে হবে, যাতে নাগরিক সহজে অগ্রগতি জানতে পারেন। অভিযোগ পাওয়ার পর কত দিনের মধ্যে প্রাথমিক জবাব, তদন্ত ও চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হবে, তা সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে স্পষ্টভাবে জানাতে হবে। সময়সীমা পেরোলে বিলম্বের কারণ লিখিতভাবে জানানো এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। তবে সব অভিযোগের জন্য একই সময়সীমা বাস্তবসম্মত নয়; অভিযোগের ধরন ও জরুরিতা অনুযায়ী সময় ঠিক করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, অভিযোগ নিষ্পত্তির তথ্য দপ্তরের অভ্যন্তরীণ নথিতে আটকে রাখা যাবে না। ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষা করে অভিযোগের সংখ্যা, নিষ্পত্তির হার, গড় সময়, অনিষ্পন্ন আবেদনের সংখ্যা এবং পুনরায় খোলা অভিযোগের তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা উচিত। এতে বোঝা যাবে কোন দপ্তর কতটা কার্যকর, কোথায় দীর্ঘসূত্রতা এবং কোন সমস্যার পুনরাবৃত্তি ঘটছে।
তৃতীয়ত, অভিযোগকারীকে এসএমএস, ফোন বা অনলাইনে অগ্রগতি জানাতে হবে। সিদ্ধান্তে অসন্তুষ্ট হলে পুনর্বিবেচনা বা উচ্চতর কর্তৃপক্ষের কাছে যাওয়ার সুযোগও স্পষ্ট থাকতে হবে।
চতুর্থত, অভিযোগ নিষ্পত্তির মান যাচাইয়ে নিয়মিত স্বাধীন পর্যালোচনা দরকার। বিশেষ করে দুর্নীতি, হয়রানি ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট অভিযোগে নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে। নিষ্পত্তির নামে দায় এড়ানো, তথ্য গোপন বা ইচ্ছাকৃত বিলম্বের প্রমাণ মিললে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে অভিযোগ বিশ্লেষণ করে বারবার ঘটা সমস্যা শনাক্ত করে স্থায়ী সমাধানে যেতে হবে। একটি নষ্ট রাস্তা বারবার মেরামতের চেয়ে কেন তা বারবার নষ্ট হচ্ছে, সেটি খুঁজে বের করা বেশি জরুরি।
এখানে নাগরিকের দায়িত্বও অস্বীকার করা যায় না। অভিযোগ হতে হবে তথ্যভিত্তিক, সুনির্দিষ্ট এবং যথাসম্ভব প্রমাণসমর্থিত। ব্যক্তিগত বিরোধ, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার বা যাচাইহীন তথ্য দিয়ে অভিযোগ ব্যবস্থাকে ব্যস্ত রাখা উচিত নয়। তবে তথ্য অসম্পূর্ণ হলেই নাগরিককে ফিরিয়ে দেওয়া চলবে না; প্রয়োজনীয় তথ্য পূরণে সহায়তা করাও দপ্তরের দায়িত্ব। প্রশাসন ও নাগরিকের এই পারস্পরিক সহযোগিতাই কার্যকর প্রতিকারব্যবস্থার ভিত্তি।
রাষ্ট্রের কাছে নাগরিকের অভিযোগ কোনো অনুগ্রহ প্রার্থনা নয়; এটি সেবা, অধিকার ও জবাবদিহির দাবি। অভিযোগ জমা দেওয়ার পর সেটি কোথায় গেল, কী ব্যবস্থা হলো, কেন সমাধান হলো না, এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার অধিকার নাগরিকের থাকা উচিত। ফাইলের পাতা যতই ভরুক, মানুষের ভোগান্তি না কমলে সেই প্রশাসনিক ব্যস্ততার কোনো সার্থকতা নেই।
প্রশাসনের লক্ষ্য হওয়া উচিত অভিযোগের সংখ্যা কম দেখানো নয়, অভিযোগের কারণ কমানো। আর নিষ্পত্তির সাফল্য নির্ধারিত হোক নথিতে সইয়ের ভিত্তিতে নয়, নাগরিকের বাস্তব অভিজ্ঞতায়। কারণ, যে অভিযোগ প্রতিকার পায় না, তা কেবল একটি ফাইলের ব্যর্থতা নয়; তা রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থারও ক্ষয়।
উপজেলা পরিষদ মার্কেট, (২য় তলা) রুম নং-২৩, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ৬৩০০
২০২৫ © দৈনিক অধিকার কতৃক সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত