বেকারত্ব শুধু অর্থনৈতিক সংকট নয়; এটি একটি দেশের সম্ভাবনা, আত্মবিশ্বাস ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্যও বড় হুমকি। যে তরুণের হাতে থাকার কথা উৎপাদন ও উদ্ভাবনের হাতিয়ার, তার জীবনে যখন দীর্ঘ অপেক্ষা আর অনিশ্চয়তা নেমে আসে, তখন ক্ষতিগ্রস্ত হয় ব্যক্তি, পরিবার ও রাষ্ট্র। শিক্ষিত তরুণের কর্মহীনতা এবং যোগ্যতা অনুযায়ী কাজের অভাব আমাদের সামনে একটি মৌলিক প্রশ্ন তুলে ধরে জনসংখ্যাকে জনশক্তিতে রূপান্তরের কথা বলা হলেও সেই শক্তিকে কাজে লাগানোর কার্যকর ব্যবস্থা কতটুকু গড়ে উঠেছে?বেকারত্ব দূর করতে শুধু চাকরির বিজ্ঞপ্তি বা আশ্বাস বাড়ালে চলবে না। প্রয়োজন কর্মমুখী শিক্ষা, উৎপাদনশীল বিনিয়োগ, উদ্যোক্তাবান্ধব পরিবেশ এবং স্বচ্ছ নিয়োগব্যবস্থার সমন্বিত বাস্তবায়ন।
শিক্ষা হতে হবে কর্মসংস্থানমুখী। প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী সনদ অর্জন করলেও তাঁদের অনেকের দক্ষতা শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলে শিক্ষিত হয়েও অনেকে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করতে পারেন না। এ ব্যবধান কমাতে পাঠ্যক্রমে ব্যবহারিক শিক্ষা, তথ্যপ্রযুক্তি, যোগাযোগ ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতাকে গুরুত্ব দিতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সংযোগ বাড়িয়ে ইন্টার্নশিপ ও শিক্ষানবিশির সুযোগ তৈরি করতে হবে।একই সঙ্গে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রসার জরুরি। আধুনিক যন্ত্রপাতি পরিচালনা, বৈদ্যুতিক কাজ, যন্ত্র মেরামত, কৃষিপ্রযুক্তি ও তথ্যপ্রযুক্তিতে দক্ষ কর্মী তৈরির মাধ্যমে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব। শিক্ষার সাফল্য শুধু সনদে নয়, কর্মজীবনে তার প্রয়োগেও পরিমাপ করতে হবে।
চাকরির অপেক্ষা নয়, কর্মসংস্থানের নতুন ক্ষেত্র তৈরি করতে হবে। সীমিত সরকারি পদের ওপর নির্ভর করে বিপুল কর্মপ্রত্যাশীর কর্মসংস্থান সম্ভব নয়। তাই বেসরকারি শিল্প, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ, কৃষি, পর্যটন এবং সৃজনশীল শিল্পের বিকাশে গুরুত্ব দিতে হবে। বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ঐতিহাসিক স্থাপনা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে কাজে লাগিয়ে পরিকল্পিত পর্যটনশিল্প গড়ে তুললে পরিবহন, আবাসন, খাবার, হস্তশিল্প ও স্থানীয় সেবায় নতুন কাজ সৃষ্টি হতে পারে।কৃষিকে শুধু উৎপাদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে কৃষিপণ্য সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্যাকেজিং ও বিপণনভিত্তিক শিল্প গড়ে তুলতে হবে। কৃষকের ন্যায্য মূল্য, সহজ ঋণ, আধুনিক প্রযুক্তি ও বাজারসংযোগ নিশ্চিত করা গেলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে কর্মসংস্থান বাড়বে এবং শহরমুখী চাপ কমবে।
তরুণ উদ্যোক্তাদের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হবে। অনেক তরুণের উদ্যোগ ও নতুন ধারণা থাকলেও পুঁজি, প্রশিক্ষণ এবং বাজারসংযোগের অভাবে তাঁরা ব্যবসা শুরু করতে পারেন না। সহজ শর্তে ঋণ, ব্যবসায়িক পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। তবে শুধু ঋণ বিতরণই যথেষ্ট নয়; উদ্যোগের বাজারচাহিদা, পরিচালনাগত দক্ষতা ও আর্থিক স্থায়িত্বও বিবেচনায় নিতে হবে। অন্যথায় কর্মসংস্থানের স্বপ্ন দেখাতে গিয়ে তরুণদের ঋণের বোঝায় ফেলার ঝুঁকি তৈরি হবে।বিনিয়োগ ও নিয়োগে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। শিল্পকারখানা স্থাপন এবং ব্যবসা সম্প্রসারণে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি, উন্নত অবকাঠামো, নীতির ধারাবাহিকতা ও সহজ প্রশাসনিক সেবা প্রয়োজন। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, হয়রানি ও দুর্নীতি কমিয়ে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে হবে। কারণ বিনিয়োগ বাড়লে উৎপাদন সম্প্রসারিত হয়, আর উৎপাদনের সঙ্গে বাড়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ।
অন্যদিকে নিয়োগ-বাণিজ্য, স্বজনপ্রীতি ও অনিয়ম মেধাবীদের হতাশ করে এবং প্রতিষ্ঠানের দক্ষতা নষ্ট করে। সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতে যোগ্যতাভিত্তিক নিয়োগ, স্বচ্ছ মূল্যায়ন এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা থাকতে হবে। নতুন পদ সৃষ্টি করার পাশাপাশি বিদ্যমান পদে নিয়োগপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতাও কমানো প্রয়োজন।নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে কর্মবাজারে যুক্ত করতে হবে। নিরাপদ কর্মপরিবেশ, সমান সুযোগ, মাতৃত্বকালীন সুবিধা ও শিশুযত্নের ব্যবস্থা নিশ্চিত করে নারীর কর্মসংস্থান বাড়ানো জরুরি। একইভাবে গ্রামীণ তরুণ, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর উপযোগী প্রশিক্ষণ ও কাজের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। দেশের বিপুল মানবসম্পদকে কর্মহীন রেখে উন্নয়নের পূর্ণ সুফল অর্জন সম্ভব নয়।
ফ্রিল্যান্সিং ও তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক কাজের সুযোগ সম্প্রসারণের পাশাপাশি মানসম্মত ইন্টারনেট, বাস্তব দক্ষতা ও আন্তর্জাতিক বাজার সম্পর্কে জ্ঞান বাড়াতে হবে। বিদেশে দক্ষ জনশক্তি পাঠানোর ক্ষেত্রেও চাহিদাভিত্তিক প্রশিক্ষণ, স্বীকৃত সনদ, নিরাপদ অভিবাসন এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের অযৌক্তিক ব্যয় নিয়ন্ত্রণ জরুরি।কর্মসংস্থান নীতির সাফল্য মাপতে হবে বাস্তব ফলাফলে। কতজন প্রশিক্ষণ পেলেন, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কতজন কাজ পেলেন। কতটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান অনুমোদন পেল, তার চেয়ে জরুরি কতটি চালু হলো এবং কত মানুষের টেকসই কর্মসংস্থান সৃষ্টি করল। এ জন্য নিয়মিত শ্রমবাজার জরিপ, চাহিদাভিত্তিক প্রশিক্ষণ, নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা ও অগ্রগতির তথ্য প্রকাশ নিশ্চিত করতে হবে। সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় এবং জবাবদিহিও বাড়াতে হবে।
বেকারত্বের সমাধান কোনো একক উদ্যোগে সম্ভব নয়; প্রয়োজন শিক্ষা, বিনিয়োগ, শিল্পায়ন ও দক্ষতা উন্নয়নের সমন্বিত প্রয়াস। তরুণেরা করুণা নয়, কাজের সুযোগ চান; আশ্বাস নয়, বাস্তব উদ্যোগ চান। তাঁদের মেধা ও শ্রমকে অব্যবহৃত রেখে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। বেকারত্বের অপেক্ষার প্রহর শেষ হবে তখনই, যখন শিক্ষা দক্ষতায়, বিনিয়োগ উৎপাদনে এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিশ্রুতি বাস্তব কর্মসংস্থানে রূপ নেবে। অন্যথায় সম্ভাবনাময় জনসংখ্যা জাতীয় সম্পদে পরিণত হওয়ার বদলে অপূর্ণ সম্ভাবনার প্রতীক হয়েই থাকবে।