বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ই-কমার্স এখন আর শুধু অনলাইনে পণ্য কেনাবেচার মাধ্যম নয়। উদ্যোক্তা তৈরি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসার সম্প্রসারণ এবং ডিজিটাল অর্থনীতির বিকাশে এ খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এই খাতের ব্যবসায়ীদের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ই-ক্যাব) তাই উদ্যোক্তাদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতিষ্ঠান।
কিন্তু সংগঠনটির ২০২৫–২০২৭ মেয়াদের কার্যনির্বাহী পরিষদের নির্বাচন ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তা সদস্যদের মধ্যে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। বারবার নির্বাচনী কার্যক্রম থমকে যাওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই সামনে এসেছে একটি প্রশ্ন—ই-ক্যাব নির্বাচনের অনিশ্চয়তা কবে কাটবে?
২০২৫ সালের ৩১ মে নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা থাকলেও ১৪ মে তা স্থগিত করা হয়। পরে ২৬ জুলাই নতুন তারিখ নির্ধারণ করা হলেও আইনি জটিলতায় নির্বাচনী কার্যক্রম আবারও বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে নতুন নেতৃত্বের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তরের প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হয়েছে।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে নির্বাচনী কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ দেখা গেছে। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে আইনি জটিলতা নিষ্পত্তির পর নির্বাচন ও আপিল বোর্ড পুনর্গঠন করা হয়। এরপর প্রকাশিত নির্বাচনী সূচি অনুযায়ী, আগামী ১৯ ডিসেম্বর সরাসরি ভোটের মাধ্যমে কার্যনির্বাহী পরিষদের ১১টি পদে নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে।
এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা এবং নির্ধারিত সময়ে নির্বাচন সম্পন্ন হওয়া এক বিষয় নয়। তাই সর্বশেষ আনুষ্ঠানিক নোটিশ, সম্ভাব্য সংশোধনী এবং নির্বাচন বোর্ডের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতেই নির্বাচনী অগ্রগতি মূল্যায়ন করতে হবে। একই সঙ্গে অতীতে নির্বাচন স্থগিত হওয়ার আইনি, প্রশাসনিক ও ভোটার তালিকাসংক্রান্ত কারণগুলোও যথাযথ নথি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্যের ভিত্তিতে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
কোনো নির্বাচন একাধিকবার পিছিয়ে গেলে তার প্রভাব শুধু ক্যালেন্ডারে সীমাবদ্ধ থাকে না। সদস্যদের পরিকল্পনা, প্রার্থীদের প্রস্তুতি, সংগঠনের কার্যক্রম এবং নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা—সবকিছুর ওপরই এর প্রভাব পড়তে পারে। এ কারণে নির্বাচন কেন পিছিয়েছে, কীভাবে জটিলতা তৈরি হয়েছে এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে—এসব প্রশ্নের স্বচ্ছ ব্যাখ্যা থাকা জরুরি।
ই-ক্যাবের সামনে এখন কয়েকটি সম্ভাবনা রয়েছে। প্রথমত, ঘোষিত সময়সূচি অনুযায়ী নির্বাচন সম্পন্ন হলে সংগঠনটি নির্বাচিত নেতৃত্বের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তরের সুযোগ পাবে। এতে প্রাতিষ্ঠানিক ধারাবাহিকতা ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি সদস্যদের আস্থা পুনর্গঠনের পথ তৈরি হতে পারে।
তবে শুধু ভোট গ্রহণ ও ফলাফল ঘোষণার মধ্য দিয়ে সব সমস্যার সমাধান হবে না। নির্বাচনী প্রক্রিয়ার গ্রহণযোগ্যতা, সদস্যদের অংশগ্রহণ, ভোটাধিকার নিশ্চিত করা এবং অভিযোগের কার্যকর নিষ্পত্তিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এসব ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বজায় রাখা না গেলে নতুন নেতৃত্বের যাত্রার শুরুতেই আস্থার ঘাটতি থেকে যেতে পারে।
দ্বিতীয়ত, আইনি, প্রশাসনিক কিংবা নথিপত্রসংক্রান্ত নতুন কোনো জটিলতা তৈরি হলে নির্বাচনী সময়সূচি আবারও প্রভাবিত হওয়ার আশঙ্কা থাকবে। এ ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে আগেভাগে ঝুঁকি শনাক্ত করা, আপিল নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা রাখা এবং প্রতিটি সিদ্ধান্তের যৌক্তিক ব্যাখ্যা প্রকাশ করা প্রয়োজন।
এ পর্যায়ে ই-ক্যাবের সদস্যদেরও দায়িত্ব রয়েছে। সদস্যপদ নবায়ন, বকেয়া চাঁদা পরিশোধ, প্রয়োজনীয় ব্যবসায়িক নথি হালনাগাদ এবং ভোটার তালিকা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা অনুসরণ করা জরুরি। ভোটার তালিকায় কোনো অসংগতি থাকলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আপত্তি জানানো উচিত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত তথ্যকে চূড়ান্ত বলে ধরে না নিয়ে নির্বাচন বোর্ডের আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তির সঙ্গে মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।
নির্বাচনী আলোচনায় প্রার্থীদের কর্মপরিকল্পনাও গুরুত্ব পাওয়া উচিত। তাঁরা কীভাবে সদস্যদের ব্যবসায়িক সমস্যার সমাধান করবেন, কীভাবে সংগঠনের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করবেন এবং নিজেদের কাজের জন্য কীভাবে জবাবদিহি করবেন—এসব প্রশ্নের উত্তর ভোটারদের জানা প্রয়োজন।
ই-কমার্স উদ্যোক্তাদের সামনে ভ্যাট ও করসংক্রান্ত জটিলতা, পেমেন্ট ব্যবস্থাপনা, গ্রাহকের আস্থা, ব্যবসার সম্প্রসারণ, নীতিগত সহায়তা এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধির মতো নানা চ্যালেঞ্জ রয়েছে। নতুন নেতৃত্বকে এসব বিষয়ে বাস্তবভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা নিয়ে এগোতে হবে। সংগঠনটি যেন কেবল নির্বাচিত কয়েকজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং বিভিন্ন আকারের ব্যবসায়ীদের মতামত ও প্রয়োজনের প্রতিনিধিত্ব করে, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি।
একটি বাণিজ্য সংগঠনের নির্বাচন শুধু পদধারী নির্ধারণের প্রক্রিয়া নয়। এটি সদস্যদের মতামত প্রকাশ, নেতৃত্বের কাছে প্রত্যাশা তুলে ধরা এবং সংগঠনের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে অংশ নেওয়ার সুযোগ। তাই নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করতে প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষগুলোর মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, নিয়মের প্রতি আনুগত্য এবং তথ্যভিত্তিক আলোচনা প্রয়োজন।
ই-ক্যাবের ভবিষ্যৎ নিয়ে নিশ্চিত কোনো পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব নয়। তবে নির্ধারিত সময়সূচি অনুসরণ, নির্বাচনী বিধি যথাযথভাবে প্রয়োগ এবং অভিযোগের স্বচ্ছ নিষ্পত্তি নিশ্চিত করা গেলে দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা কাটিয়ে ওঠার সুযোগ তৈরি হবে। এর বিপরীতে নতুন করে জটিলতা দেখা দিলে সদস্যদের আস্থা ফিরিয়ে আনার কাজ আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
ই-ক্যাবের নির্বাচন ঘিরে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা একটি বিষয় সামনে এনেছে—নির্বাচন আয়োজন করা যেমন জরুরি, তেমনি তা বিশ্বাসযোগ্যভাবে সম্পন্ন করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। নেতৃত্বের পরিবর্তন সংগঠনকে নতুন সম্ভাবনা দিতে পারে; কিন্তু সেই সম্ভাবনাকে বাস্তব অগ্রগতিতে রূপ দিতে হলে প্রয়োজন কার্যকর উদ্যোগ, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি।
শেষ পর্যন্ত ই-ক্যাব কোন পথে এগোবে, তা শুধু নির্বাচনের তারিখ বা ১১টি পদে কারা নির্বাচিত হবেন, তার ওপর নির্ভর করবে না। নির্ভর করবে নতুন নেতৃত্ব সদস্যদের কতটা কার্যকরভাবে প্রতিনিধিত্ব করছে, ব্যবসায়িক সমস্যার সমাধানে কতটা ভূমিকা রাখছে এবং সংগঠনের প্রতি আস্থা পুনর্গঠনে কতটা সফল হচ্ছে, তার ওপর।
এখন প্রয়োজন পারস্পরিক দোষারোপের পরিবর্তে তথ্যভিত্তিক আলোচনা, ব্যক্তিকেন্দ্রিক প্রতিযোগিতার পরিবর্তে কর্মপরিকল্পনাভিত্তিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং অনিশ্চয়তার পরিবর্তে সুস্পষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া। ই-ক্যাবের নির্বাচন দেশের ই-কমার্স উদ্যোক্তাদের প্রতিনিধিত্ব ও প্রাতিষ্ঠানিক ভবিষ্যতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় সফল হতে হলে নির্বাচন হতে হবে স্বচ্ছ, অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য; আর নির্বাচিত নেতৃত্বকে প্রমাণ করতে হবে, সংগঠনটি সব সদস্যের স্বার্থ ও অগ্রগতির জন্য কাজ করে।
উপজেলা পরিষদ মার্কেট, (২য় তলা) রুম নং-২৩, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ৬৩০০
২০২৫ © দৈনিক অধিকার কতৃক সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত