ইরানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক অভিযানের পরিকল্পনা প্রস্তুত থাকলেও আপাতত হামলার নির্দেশ দেননি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার ঝুঁকি, আঞ্চলিক মিত্রদের উদ্বেগ, ইরানের সম্ভাব্য পাল্টা হামলা এবং কূটনৈতিক সমাধানের সুযোগ—সব মিলিয়ে ওয়াশিংটনের সিদ্ধান্তে জটিলতা তৈরি হয়েছে।
মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাতে সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) ও পেন্টাগন ইরানের জ্বালানি অবকাঠামো, সামরিক স্থাপনা এবং পারমাণবিক কেন্দ্রসহ বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুর তালিকা প্রস্তুত করেছে। প্রেসিডেন্টের নির্দেশ পেলে মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন মার্কিন বাহিনী ৯৬ ঘণ্টার মধ্যে বড় ধরনের অভিযান শুরু করতে সক্ষম বলেও কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। তবে সামরিক প্রস্তুতি থাকলেই হামলার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়েছে—এমন নয়।
আঞ্চলিক মিত্রদের উদ্বেগ
ইরানে নতুন করে হামলা হলে সংঘাত শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে উপসাগরীয় দেশগুলোতেও ছড়িয়ে পড়তে পারে—এমন আশঙ্কা রয়েছে। সৌদি আরব, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের নেতারা আগেও ওয়াশিংটনকে সামরিক পদক্ষেপের আগে কূটনৈতিক সমাধানের সুযোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বলে সিএনএনের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আঞ্চলিক দেশগুলোর উদ্বেগের অন্যতম কারণ ইরানের সম্ভাব্য প্রতিশোধমূলক হামলা। অতীতে সংঘাতের সময় উপসাগরীয় অঞ্চলে হামলা এবং জ্বালানি অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। নতুন করে যুদ্ধ শুরু হলে এসব দেশের নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও জ্বালানি সরবরাহে আরও চাপ পড়তে পারে।
ইসরায়েলের সঙ্গে যৌথ অভিযানের হিসাব
সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে নতুন হামলার পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন চেয়েছে। তবে মার্কিন কর্মকর্তারা ইসরায়েলকে আপাতত অপেক্ষা করতে বলেছেন। দুই দেশের মধ্যে সমন্বিত সামরিক পদক্ষেপের প্রস্তুতি ও সময় নির্ধারণ এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসরায়েলের সামরিক নেতৃত্বের পক্ষ থেকেও সম্ভাব্য হামলার সময় নিয়ে উদ্বেগ জানানো হয়েছে। ইসরায়েলে নির্বাচনী পরিস্থিতি ও সামরিক অভিযানের প্রভাব নিয়েও আলোচনা রয়েছে। পাশাপাশি দীর্ঘ সংঘাতের কারণে ইসরায়েলের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থার কিছু সরঞ্জামের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
হরমুজ প্রণালী নিয়ে অচলাবস্থা
পারস্য উপসাগর ও আন্তর্জাতিক জ্বালানি পরিবহনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের বিরোধও পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। এই জলপথে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে আন্তর্জাতিক তেলের বাজার ও বৈশ্বিক বাণিজ্যে প্রভাব পড়তে পারে।
ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে প্রণালী খুলে দেওয়া, নৌ-অবরোধ, নিষেধাজ্ঞা এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে। এসব বিষয়ে সমঝোতা ছাড়া সামরিক উত্তেজনা কমানো কঠিন হতে পারে।
তেহরানে কূটনৈতিক তৎপরতা
সামরিক প্রস্তুতির পাশাপাশি সংঘাত এড়াতে কূটনৈতিক তৎপরতাও চলছে। সোমবার (২৬ অক্টোবর) সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের প্রতিনিধিরা ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনার জন্য তেহরানে পৌঁছেছেন। আলোচনায় আঞ্চলিক নিরাপত্তা, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্ক এবং সংঘাত প্রশমনের সম্ভাব্য পথ নিয়ে কথা হওয়ার কথা রয়েছে।
পাকিস্তান ও কাতারও মধ্যস্থতার উদ্যোগে যুক্ত রয়েছে। তবে আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতা হবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নিষেধাজ্ঞা, নৌ-অবরোধ ও হরমুজ প্রণালী নিয়ে বিরোধের কারণে সমাধানের পথ কঠিন হয়ে আছে।
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ট্রাম্পের
সিএনএনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক পদক্ষেপের বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেননি। তাঁর প্রশাসনের সামনে একদিকে সামরিক বিকল্প রয়েছে, অন্যদিকে রয়েছে সংঘাত বিস্তৃত হওয়ার ঝুঁকি ও আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের সম্ভাবনা।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনও সম্ভাব্য পদক্ষেপের সময় নিয়ে আলোচনায় এসেছে। তবে নির্বাচনের পরপরই হামলা হবে—এমন কোনো নিশ্চিত সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়নি।
সব মিলিয়ে, ইরানে হামলা স্থগিত রাখার পেছনে একক কোনো কারণ নয়; বরং আঞ্চলিক মিত্রদের উদ্বেগ, সম্ভাব্য পাল্টা আক্রমণ, ইসরায়েলের সঙ্গে সমন্বয় এবং কূটনৈতিক প্রচেষ্টার সম্মিলিত প্রভাব রয়েছে বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলো থেকে ধারণা পাওয়া যায়। পরিস্থিতির পরবর্তী গতিপথ নির্ভর করছে ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনার অগ্রগতির ওপর।
উপজেলা পরিষদ মার্কেট, (২য় তলা) রুম নং-২৩, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ৬৩০০
২০২৫ © দৈনিক অধিকার কতৃক সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত