জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ কক্সবাজার জেলা কল্যাণ সমিতির মানুষগুলো। এই সংগঠনের বড় ভাই, ছোট ভাই ও বন্ধুদের সঙ্গে কাটানো মুহূর্তগুলো আমার জীবনে আলাদা জায়গা করে নিয়েছে। কখনো একসঙ্গে কোনো আয়োজনে অংশ নেওয়া, কখনো প্রয়োজনের সময়ে পাশে দাঁড়ানো, আবার কখনো নিছক আড্ডায় সময় কাটানো—এসবের মধ্য দিয়েই গড়ে উঠেছে আন্তরিকতার বন্ধন।
নিজের জেলা থেকে দূরে থেকেও জেলার মানুষের সঙ্গে আপনজনের মতো মিশে যাওয়ার মধ্যে একধরনের প্রশান্তি রয়েছে। বাড়ি থেকে দূরে থাকার সময় এই মানুষগুলোর সান্নিধ্যে অনেকবার নিজের এলাকার মানুষের কাছাকাছি থাকার অনুভূতি পেয়েছি। তাঁদের সঙ্গে কাটানো সময়গুলোও আমার বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের সুন্দর স্মৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে থাকবে।
একটি ক্যাম্পাস কেবল কয়েকটি একাডেমিক ভবন, রাস্তা কিংবা খোলা মাঠের সমষ্টি নয়। একজন শিক্ষার্থীর কাছে ক্যাম্পাস মানে তার বেড়ে ওঠার গল্প, স্বপ্ন দেখার জায়গা এবং জীবনের অসংখ্য অনুভূতির আশ্রয়। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসও আমার কাছে ঠিক তেমনই।
এই ক্যাম্পাসের কত জায়গায় কত স্মৃতি ছড়িয়ে আছে, তার হিসাব হয়তো কখনো করা সম্ভব নয়। কোথাও বন্ধুদের সঙ্গে দীর্ঘ আড্ডা, কোথাও একা বসে নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবা; কোথাও আনন্দে মেতে ওঠা, আবার কোথাও মন খারাপের দিনগুলো নীরবে পার করা। চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে কত পরিকল্পনা করেছি, কত স্বপ্ন দেখেছি! কত গল্পের শুরু হয়েছে, কত গল্প আবার অসমাপ্ত থেকে গেছে!
ক্যাম্পাসের পরিচিত রাস্তা ধরে হাঁটতে হাঁটতে কখনো মনে হয়নি, একদিন এই পথগুলোও স্মৃতি হয়ে যাবে। আজ মনে হচ্ছে, প্রতিটি বাঁক, প্রতিটি পরিচিত জায়গা যেন আমার জীবনের কোনো না কোনো গল্পের সাক্ষী। হয়তো আগামীকালও ক্যাম্পাস ঠিক আগের মতোই থাকবে। ক্লাস চলবে, শিক্ষার্থীরা আসবে, আড্ডা জমবে, নতুন বন্ধুত্ব তৈরি হবে। নতুন শিক্ষার্থীরা তাদের স্বপ্ন নিয়ে এই ক্যাম্পাসে আসবে, নতুন গল্প তৈরি হবে, নতুন স্মৃতিতে ভরে উঠবে পরিচিত প্রাঙ্গণ। শুধু সেই চেনা দৃশ্যগুলোর মধ্যে আমার নিয়মিত উপস্থিতি আর থাকবে না।
কুষ্টিয়ায় কাটানো সময় শুধু আনন্দের ছিল না। এখানে যেমন অনেক সুন্দর মুহূর্ত পেয়েছি, তেমনি পেয়েছি কষ্ট, অভিমান, হতাশা আর জীবনের কঠিন কিছু অভিজ্ঞতা। কিছু মানুষকে খুব আপন ভেবেছি, কেউ কেউ সত্যিই আপন হয়ে পাশে থেকেছে। আবার কিছু অভিজ্ঞতা শিখিয়েছে, জীবনের সব সম্পর্ক একই রকম হয় না।
তবে এসব অভিজ্ঞতাও আমার কাছে মূল্যবান। কারণ, বিশ্ববিদ্যালয়জীবন শুধু আনন্দের স্মৃতি তৈরি করে না; মানুষকে চিনতে শেখায়, বাস্তবতা বুঝতে শেখায়, নিজের শক্তি ও সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে সচেতন করে এবং জীবনের পরবর্তী অধ্যায়ের জন্য প্রস্তুত করে।
এই শহর আমাকে শুধু শিক্ষার সুযোগ দেয়নি; দিয়েছে নিজেকে নতুনভাবে চেনার অভিজ্ঞতা। বাড়ি থেকে দূরে থাকা, নিজের কাজ নিজে সামলানো, প্রতিকূলতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া, নতুন মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করা এবং ভবিষ্যতের স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে চলা—সবকিছুই আমাকে আগের চেয়ে পরিণত করেছে।
আজ পেছনে ফিরে তাকালে বুঝতে পারি, এই শহরের প্রতিটি দিন, প্রতিটি অভিজ্ঞতা আমার ব্যক্তিত্ব গঠনে কোনো না কোনোভাবে ভূমিকা রেখেছে। তাই কুষ্টিয়াকে বিদায় জানানো মানে শুধু একটি শহর ছেড়ে যাওয়া নয়; বরং এই শহরের কাছে শেখা অসংখ্য পাঠকে সঙ্গে নিয়ে জীবনের নতুন পথে যাত্রা শুরু করা।
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা সবসময় থাকবে। এই বিশ্ববিদ্যালয় আমাকে উচ্চশিক্ষার সুযোগ দিয়েছে, জ্ঞান অর্জনের পরিবেশ দিয়েছে এবং এমন কিছু মানুষের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে, যাঁদের সান্নিধ্য আমার জীবনকে সমৃদ্ধ করেছে। শিক্ষকদের দিকনির্দেশনা, সহপাঠীদের সহযোগিতা, সিনিয়রদের স্নেহ এবং জুনিয়রদের ভালোবাসা—সবকিছু মিলিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়জীবন হয়ে উঠেছে এক অনন্য অভিজ্ঞতা।
আজ বিদায়ের মুহূর্তে মনে হচ্ছে, জীবনের একটি অধ্যায় শেষ হয়ে আরেকটি অধ্যায় শুরু হতে যাচ্ছে। সামনে অপেক্ষা করছে নতুন দায়িত্ব, নতুন চ্যালেঞ্জ, নতুন স্বপ্ন এবং অজানা অনেক পথ। হয়তো জীবনের ব্যস্ততায় প্রতিদিনের স্মৃতিগুলো মনে করার সুযোগ হবে না, হয়তো প্রিয় মানুষগুলোর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগও সম্ভব হবে না। তবু বিশ্বাস করি, সময় ও দূরত্বের ব্যবধান যতই বাড়ুক, আন্তরিক সম্পর্কের মূল্য কখনো কমে যায় না।
কোনো এক অলস বিকেলে, কোনো পরিচিত গানের সুরে কিংবা হঠাৎ পুরোনো কোনো ছবি চোখে পড়লে আবার ফিরে আসবে এই ক্যাম্পাসের দিনগুলো। মনে পড়বে বন্ধুদের সঙ্গে কাটানো দীর্ঘ আড্ডা, বিভাগের অনুষ্ঠান ঘিরে ব্যস্ততা, চায়ের কাপ হাতে ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখা আর কুষ্টিয়ার পরিচিত পথ ধরে হেঁটে বেড়ানোর দিনগুলো।
হয়তো একদিন অনেক বছর পর আবার এই শহরে ফিরে আসব। হয়তো ক্যাম্পাসের পরিচিত রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে খুঁজব পুরোনো দিনগুলোর ছায়া। কিছু জায়গা বদলে যাবে, কিছু মুখ আর দেখা যাবে না, সময়ের সঙ্গে অনেক কিছুই নতুন রূপ নেবে। তবু মনের ভেতর থেকে যাবে সেই পুরোনো অনুভূতি—এই শহরেই তো জীবনের কত সুন্দর সময় কাটিয়েছি! এই শহরেই তো কিছু মানুষকে আপন করে পেয়েছি! এই শহরেই তো স্বপ্ন দেখতে শিখেছি, জীবনের বাস্তবতা বুঝেছি এবং নিজেকে গড়ে তোলার পথে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ অতিক্রম করেছি।
কুষ্টিয়া, তোমাকে বিদায় জানানো সহজ নয়। কারণ, তুমি আমার কাছে কেবল একটি শহর নও; তুমি আমার শিক্ষাজীবনের স্মৃতি, বন্ধুত্বের গল্প, আনন্দ-বেদনার সাক্ষী এবং বেড়ে ওঠার এক অবিচ্ছেদ্য অধ্যায়। তোমার বুকে কাটানো দিনগুলো হয়তো আর ফিরে পাব না, কিন্তু সেই দিনগুলোর স্মৃতি সারাজীবন আমার সঙ্গে থাকবে।
আজ তাই বিদায় বলছি, কিন্তু ভুলে যাওয়ার জন্য নয়; বরং হৃদয়ের গভীরে যত্ন করে স্মৃতিগুলো রেখে দেওয়ার জন্য। জীবনের প্রয়োজনে চলে যাচ্ছি, কিন্তু এই শহরের প্রতি ভালোবাসা সঙ্গে নিয়েই এগিয়ে যাব নতুন গন্তব্যের পথে।
বিদায় কুষ্টিয়া। বিদায়, প্রিয় ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়। তুমি আমার জীবনের এমন এক অধ্যায়, যার পাতা বন্ধ হয়ে গেলেও গল্প কখনো শেষ হবে না।
লেখক: আরফানুল ইসলাম রিফাত
স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী, ফলিত রসায়ন ও কেমিকৌশল বিভাগ
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।
উপজেলা পরিষদ মার্কেট, (২য় তলা) রুম নং-২৩, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ৬৩০০
২০২৫ © দৈনিক অধিকার কতৃক সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত