আফ্রিকার হর্ন অব আফ্রিকা অঞ্চলে নিজেদের কৌশলগত প্রভাব বাড়ানোর পাশাপাশি সামরিক সক্ষমতা জোরদারে ইথিওপিয়াকে উন্নত যুদ্ধবিমান ও আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সরবরাহ করছে রাশিয়া। ইথিওপিয়ার প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদ জানিয়েছেন, আগের চুক্তির আওতায় তাঁর দেশ রাশিয়ার তৈরি ১২টি সু-৩৫ যুদ্ধবিমান পাওয়ার কথা রয়েছে। পাশাপাশি চারটি এস-৪০০ আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সরবরাহের পরিকল্পনাও রয়েছে।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) মস্কোয় রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে বৈঠকের সময় এসব তথ্য জানান আবি আহমেদ। দুই দিনের রাশিয়া-আফ্রিকা সম্মেলনে অংশ নিতে তিনি রাশিয়া সফর করছেন।
তবে যুদ্ধবিমান সরবরাহের সংখ্যা নিয়ে প্রতিবেদনে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। ইথিওপিয়ার প্রধানমন্ত্রী ১২টি যুদ্ধবিমান পাওয়ার কথা জানালেও রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় অস্ত্র রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান রোসোবোরোনএক্সপোর্ট রয়টার্সকে জানিয়েছে, প্রথম চালানে দুটি সু-৩৫ সরবরাহ করা হয়েছে। অন্যদিকে, চারটি এস-৪০০ ব্যবস্থার সরবরাহ কবে সম্পন্ন হবে, তা এখনো জানানো হয়নি।
পুতিন বলেন, আন্তর্জাতিক বিষয়ে রাশিয়া ও ইথিওপিয়া একসঙ্গে কাজ করছে। আবি আহমেদের মতে, নতুন সামরিক সরঞ্জাম দেশটির প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি সম্ভাব্য আগ্রাসন প্রতিরোধে ভূমিকা রাখবে।
আকাশ প্রতিরক্ষায় বাড়তি সক্ষমতা
বিশ্লেষকদের মতে, সু-৩৫ যুদ্ধবিমান ইথিওপিয়ার বিমানবাহিনীর আক্রমণ ও প্রতিরক্ষা—দুই ধরনের সক্ষমতাই বাড়াতে পারে। অন্যদিকে, এস-৪০০ দীর্ঘপাল্লার আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা। এটি শত্রুপক্ষের যুদ্ধবিমান, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রসহ বিভিন্ন আকাশপথের হুমকি মোকাবিলায় ব্যবহৃত হয়।
ঝুঁকি বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান সিবিলাইনের মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকাবিষয়ক জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক বেনেডিক্ট মানজিন আল-জাজিরাকে বলেন, প্রতিবেশী ইরিত্রিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ শুরু হলে দেশটির সীমিত বিমানবাহিনী ও ড্রোন মোকাবিলায় এসব সামরিক সরঞ্জাম কাজে লাগতে পারে।
তবে ছোট ও তুলনামূলক সস্তা ড্রোনের ব্যাপক আক্রমণের ক্ষেত্রে প্রচলিত আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার কার্যকারিতা সীমিত হয়ে পড়তে পারে। ইউক্রেনের যুদ্ধেও এ ধরনের চ্যালেঞ্জ দেখা গেছে বলে উল্লেখ করেছেন বিশ্লেষকেরা।
আফ্রিকায় প্রভাব বাড়াতে চায় মস্কো
রাশিয়া ও ইথিওপিয়ার সামরিক সহযোগিতা দীর্ঘদিনের। স্নায়ুযুদ্ধের সময় সোভিয়েত ইউনিয়ন ইথিওপিয়ার তৎকালীন কমিউনিস্ট সরকারকে সমর্থন দিয়েছিল। বর্তমান সামরিক সহযোগিতাকে সেই ঐতিহাসিক সম্পর্কের ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
২০২১ সালের জুলাইয়ে দুই দেশ সামরিক সহযোগিতা চুক্তি করে। এর আওতায় সামরিক প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি বিনিময় এবং ইথিওপিয়ার সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়নের বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়। নতুন যুদ্ধবিমান ও আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সরবরাহের উদ্যোগও দুই দেশের প্রতিরক্ষা সম্পর্ককে আরও গভীর করবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
অস্ত্র রপ্তানিও রাশিয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক স্বার্থ তৈরি করছে। স্টকহোম আন্তর্জাতিক শান্তি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এসআইপিআরআই) তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত আফ্রিকার দেশগুলোর প্রধান সামরিক সরঞ্জাম আমদানির ১৫ শতাংশ এসেছে রাশিয়া থেকে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ ছিল ১৯ শতাংশ এবং চীনের ১৭ শতাংশ।
বিশ্লেষকদের মতে, ইথিওপিয়ার মতো জনবহুল ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ দেশের সঙ্গে সামরিক সম্পর্ক জোরদার করে মস্কো আফ্রিকায় নিজেদের কূটনৈতিক অবস্থানও শক্তিশালী করতে চায়। তবে রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়লেও ইথিওপিয়া চীন ও পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখছে।
অভ্যন্তরীণ সংঘাত ও ইরিত্রিয়ার সঙ্গে উত্তেজনা
ইথিওপিয়ায় নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার মধ্যেই রাশিয়ার সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহের বিষয়টি সামনে এসেছে। দেশটির উত্তরাঞ্চলীয় তিগ্রায় অঞ্চলে কেন্দ্রীয় সরকার ও তিগ্রায় পিপলস লিবারেশন ফ্রন্টের (টিপিএলএফ) মধ্যে আবারও লড়াই তীব্র হয়েছে। এতে ২০২২ সালের নভেম্বরে স্বাক্ষরিত শান্তিচুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
এ ছাড়া আমহারা অঞ্চলেও সশস্ত্র বিদ্রোহ চলছে। পাশাপাশি প্রতিবেশী ইরিত্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি দুই দেশের মধ্যে সম্ভাব্য সংঘাতের আশঙ্কা বাড়িয়েছে। ফলে ইথিওপিয়ার সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগকে শুধু অস্ত্র কেনাকাটা নয়, বরং বৃহত্তর আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির অংশ হিসেবেও দেখছেন বিশ্লেষকেরা।
অক্টোবরের শুরুতে তিগ্রায় অঞ্চলের রাজধানী মেকেলেতে সরকারি বাহিনী ও তাদের মিত্ররা প্রবেশ করে। এর আগে টিপিএলএফের যোদ্ধারা শহরটি ছেড়ে সরে যান। পরে আদ্দিস আবাবা সেখানে ছয় মাসের জন্য অন্তর্বর্তী প্রশাসন গঠন করে। তবে বিদ্রোহী নেতারা লড়াই চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অস্ত্র চুক্তিই কি সংঘাতের কারণ?
ইথিওপিয়ার প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদ নতুন সামরিক সরঞ্জামকে দেশের সার্বভৌমত্ব ও প্রতিরক্ষা সক্ষমতা জোরদারের অংশ হিসেবে তুলে ধরেছেন। তবে বিশ্লেষকদের মতে, চুক্তিটি আগে থেকেই সম্পাদিত হয়ে থাকতে পারে। তাই সাম্প্রতিক সংঘাতই অস্ত্র কেনার সরাসরি কারণ—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর যথেষ্ট ভিত্তি নেই।
সব মিলিয়ে, রাশিয়ার যুদ্ধবিমান ও আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ইথিওপিয়ার সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে পারে। একই সঙ্গে এ সহযোগিতা আফ্রিকার হর্ন অব আফ্রিকা অঞ্চলে রাশিয়ার কৌশলগত উপস্থিতি আরও জোরদার করতে পারে। তবে নতুন সামরিক সরঞ্জাম আঞ্চলিক উত্তেজনা কমাবে, নাকি প্রতিদ্বন্দ্বিতা আরও বাড়াবে, তা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর ভবিষ্যৎ পদক্ষেপের ওপর।
উপজেলা পরিষদ মার্কেট, (২য় তলা) রুম নং-২৩, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ৬৩০০
২০২৫ © দৈনিক অধিকার কতৃক সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত