চ্যাটজিপিটির পরামর্শে মৃগীরোগের ওষুধের মাত্রা কমিয়ে দেওয়ার পর এক নারীর মৃত্যুর ঘটনায় ওপেনএআই ও প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা স্যাম অল্টম্যানের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন তাঁর বাবা-মা। তাঁদের অভিযোগ, চ্যাটজিপিটি ওই নারীকে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই খিঁচুনির ওষুধ বন্ধ করার পরিকল্পনা দিয়েছিল। এমনকি চিকিৎসকদের কাছ থেকে বিষয়টি গোপন রাখতেও উৎসাহিত করেছিল।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার সান ফ্রান্সিসকো সুপিরিয়র কোর্টে মামলাটি করা হয়। নিহত নারীর নাম বোয়েন ওয়ান। তাঁর বয়স ছিল ৩১ বছর। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সিয়াটলে বসবাস করতেন এবং অ্যামাজনে সফটওয়্যার প্রকৌশলী হিসেবে কাজ করতেন। টেকক্রাঞ্চ ও অন্যান্য সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মামলাটি ঘিরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার স্বাস্থ্যবিষয়ক পরামর্শের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
ওষুধের মাত্রা শূন্যে নামানোর অভিযোগ
মামলার নথি অনুযায়ী, বোয়েন ওয়ান দীর্ঘদিন ধরে মৃগীরোগে ভুগছিলেন। তাঁর খিঁচুনি নিয়ন্ত্রণে ল্যামোট্রিজিন নামের ওষুধ কার্যকর ছিল। তিনি প্রতিদিন ৪০০ মিলিগ্রাম ওষুধটি গ্রহণ করতেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরিবারের অভিযোগ, চ্যাটজিপিটির জিপিটি-৪ও মডেল তাঁকে প্রায় ২৫ দিনের মধ্যে ওষুধের মাত্রা ৪০০ মিলিগ্রাম থেকে শূন্যে নামিয়ে আনার একটি পরিকল্পনা দিয়েছিল। এই মাত্রা কমানোর বিষয়ে তাঁর চিকিৎসকের অনুমতি ছিল না বলেও মামলায় দাবি করা হয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়, বোয়েন যখন চিকিৎসকদের পরামর্শ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন, তখন চ্যাটজিপিটি তাঁকে চিকিৎসকদের কাছ থেকে ওষুধ কমানোর পরিকল্পনা গোপন রাখতে উৎসাহিত করে। এমনকি ওষুধের মাত্রা কমানোর ফলে রক্তে ওষুধের পরিমাণ কতটা রয়েছে, তা যাচাইয়ের জন্য চিকিৎসকের পরামর্শে করা রক্ত পরীক্ষায় অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্তকেও সমর্থন করেছিল বলে অভিযোগ করেছে তাঁর পরিবার।
চাকরি হারানোর আশঙ্কা ও মানসিক চাপ
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বোয়েন ওয়ান নতুন ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন। তাঁর আশঙ্কা ছিল, ওষুধের কারণে কথা বলা ও চিন্তাভাবনায় প্রভাব পড়ছে, যা নতুন চাকরির সাক্ষাৎকারে সমস্যা তৈরি করতে পারে।
২০২৫ সালের নভেম্বরে অ্যামাজন তাঁকে চাকরি থেকে ছাঁটাইয়ের কথা জানায়। এতে যুক্তরাষ্ট্রে কাজের অনুমতি ও ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়। এ পরিস্থিতিতে ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কমানোর আশায় তিনি চ্যাটজিপিটির কাছে পরামর্শ চাইতে শুরু করেন বলে মামলার নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
বোয়েনের পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি ধীরে ধীরে চ্যাটজিপিটির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। ২০২৫ সালে সপ্তাহে তাঁর বার্তা আদান-প্রদানের সংখ্যা ১ হাজার ৫০০ ছাড়িয়ে গিয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সময়ে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগও কমে আসে।
চিকিৎসকের পরামর্শ উপেক্ষার অভিযোগ
মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, ওষুধের মাত্রা কমানোর সময় বোয়েন বিভ্রান্তি, স্মৃতির সমস্যা এবং অস্বাভাবিক শারীরিক অনুভূতির কথা চ্যাটজিপিটিকে জানিয়েছিলেন। তাঁর পরিবার দাবি করেছে, এসব উপসর্গের গুরুত্ব বিবেচনা করে তাঁকে চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়ার পরিবর্তে চ্যাটবট তাঁকে আশ্বস্ত করেছিল।
বোয়েনের স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. নিকোলাস পুলোস দ্য নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেছেন, রোগীর খিঁচুনি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ওষুধ তাঁর চিকিৎসার ইতিহাস বিবেচনা না করে বন্ধ করার পরামর্শ তিনি দিতেন না। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এমন পরিস্থিতিতে ওষুধ বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়া চিকিৎসাগতভাবে গ্রহণযোগ্য হতো না।
কিং কাউন্টির মেডিকেল পরীক্ষকের তথ্য অনুযায়ী, বোয়েন ওয়ানের মৃত্যুর কারণ ছিল ‘সাডেন আনএক্সপেক্টেড ডেথ ইন এপিলেপসি’ (এসইউডিইপি)—মৃগীরোগে আক্রান্ত ব্যক্তির আকস্মিক ও অপ্রত্যাশিত মৃত্যু। মামলায় তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে চ্যাটজিপিটির দেওয়া ওষুধ কমানোর পরিকল্পনার সম্পর্ক রয়েছে বলে দাবি করেছেন বাবা-মা। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে আদালতের কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
ওপেনএআইয়ের প্রতিক্রিয়া
ওপেনএআইয়ের এক মুখপাত্র ঘটনাটিকে ‘অত্যন্ত হৃদয়বিদারক’ বলে বর্ণনা করেছেন। প্রতিষ্ঠানটির বক্তব্য, বোয়েন ওয়ান চ্যাটজিপিটির একটি পুরোনো মডেল ব্যবহার করছিলেন, যা বর্তমানে আর সেবায় নেই।
ওপেনএআই আরও জানিয়েছে, সংবেদনশীল পরিস্থিতিতে চ্যাটজিপিটির প্রতিক্রিয়া উন্নত করতে চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কাজ করা হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটির অবস্থান, চ্যাটজিপিটি পেশাদার চিকিৎসাসেবার বিকল্প নয়।
এআইয়ের স্বাস্থ্যবিষয়ক পরামর্শ নিয়ে নতুন প্রশ্ন
বোয়েন ওয়ানের মৃত্যুর ঘটনায় দায় ও ক্ষতিপূরণ নির্ধারণের বিষয়টি এখন আদালতের বিচারাধীন। মামলাটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যসংক্রান্ত পরামর্শের সীমা, ব্যবহারকারীর নিরাপত্তা এবং প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের দায় নিয়ে বিতর্ককে আরও সামনে এনেছে।
চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের সাধারণ পরামর্শ হলো, চিকিৎসকের নির্দেশ ছাড়া খিঁচুনির ওষুধ হঠাৎ বন্ধ করা বা মাত্রা পরিবর্তন করা উচিত নয়। ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিলে কিংবা মাত্রা কমানোর প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি।
উপজেলা পরিষদ মার্কেট, (২য় তলা) রুম নং-২৩, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ৬৩০০
২০২৫ © দৈনিক অধিকার কতৃক সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত