ইসরাইলের নির্বাচনে সরকার পরিবর্তন হলেও ফিলিস্তিনিদের প্রতি দেশটির নীতি ও দখলদারিত্বের বাস্তবতায় মৌলিক পরিবর্তন আসবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশ্লেষকরা। অতীতের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তাঁদের একাংশের যুক্তি, ইসরাইলের ডানপন্থী ও তুলনামূলক উদারপন্থী—উভয় রাজনৈতিক শিবিরের মধ্যেই ফিলিস্তিনের ভূখণ্ডে বসতি সম্প্রসারণ ও সামরিক নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে উল্লেখযোগ্য মিল রয়েছে।
একসময় অনেক ফিলিস্তিনি ও আরব নাগরিক ইসরাইলের নির্বাচন গভীর উদ্বেগের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করতেন। তাঁদের প্রত্যাশা ছিল না যে কোনো ইসরাইলি নেতা ক্ষমতায় এসে দখলদারিত্বের অবসান ঘটাবেন কিংবা অবৈধ বসতি সরিয়ে নেবেন। বরং তাঁদের আশঙ্কা ছিল, ক্ষমতায় আসা কোনো নেতা আগের চেয়ে বেশি উগ্র ও বিপজ্জনক নীতি গ্রহণ করতে পারেন। তাই তুলনামূলক কম কঠোর অবস্থানের পক্ষকে তাঁরা সমর্থনযোগ্য মনে করতেন।
তবে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় ফিলিস্তিনিদের সেই ধারণায় পরিবর্তন এসেছে বলে মত দিয়েছেন বিশ্লেষকরা। তাঁদের মতে, ইসরাইলের বিভিন্ন সরকারের আমলেই পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণ ও ফিলিস্তিনিদের ওপর নিপীড়ন অব্যাহত থেকেছে।
বিভিন্ন সরকারের আমলেও বেড়েছে বসতি
অসলো শান্তি চুক্তির সময় ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন আইজাক রাবিন। ফিলিস্তিনি সেন্ট্রাল ব্যুরো অব স্ট্যাটিস্টিকসের (পিসিবিএস) সংগৃহীত ইসরাইলি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৯৯২ থেকে ১৯৯৫ সালের মধ্যে পূর্ব জেরুসালেম বাদে পশ্চিম তীরে ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীর সংখ্যা ১ লাখ ১১ হাজার ৬৭৩ থেকে বেড়ে ১ লাখ ৪০ হাজার ২৩৫ জনে দাঁড়ায়। অর্থাৎ এ সময়ে জনসংখ্যা বেড়েছিল ২৫ শতাংশের বেশি।
লেবার পার্টির প্রধানমন্ত্রী এহুদ বারাকের শাসনামলেও বসতি সম্প্রসারণের ধারা অব্যাহত ছিল। ক্ষমতা গ্রহণের প্রথম ছয় মাসে তাঁর সরকার ৩ হাজার ১৯৬টি নতুন বসতি স্থাপনের দরপত্র আহ্বান করে। নিবন্ধের তথ্য অনুযায়ী, এই সংখ্যা তাঁর ডানপন্থী পূর্বসূরি বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বার্ষিক গড়ের চেয়েও বেশি ছিল।
২০২১ সালের জুনে নাফতালি বেনেট আরব দল রামের সমর্থনে জোট সরকার গঠন করলেও বসতি সম্প্রসারণ বন্ধ হয়নি। ইসরাইলি বসতি পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা পিস নাউয়ের তথ্য অনুযায়ী, বেনেট-লাপিদ সরকারের প্রথম বছরেই ৭ হাজার ২৯২টি নতুন আবাসন ইউনিট নির্মাণের পরিকল্পনা অনুমোদনের উদ্যোগ নেওয়া হয়, যা আগের নেতানিয়াহু সরকারের বার্ষিক গড়ের তুলনায় ২৬ শতাংশ বেশি।
পশ্চিম তীরে জমি দখল ও সহিংসতা
বিশ্লেষকদের মতে, পশ্চিম তীরে ইসরাইলি বসতি সম্প্রসারণ দখলদারিত্বকে স্থায়ী করার অন্যতম প্রধান উপায়। নতুন বসতি গড়তে ফিলিস্তিনিদের জমি দখল করা হয়। এসব বসতির নিরাপত্তায় ইসরাইলি সেনা মোতায়েনের পাশাপাশি পানি, সড়ক ও অন্যান্য অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়। এতে ফিলিস্তিনিদের জমি ও প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর চাপ বাড়ে এবং তাঁদের বাস্তুচ্যুত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
পিসিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ পশ্চিম তীরে ৩৫০টি আউটপোস্টসহ মোট ৬৪৫টি ইসরাইলি বসতি ও সামরিক স্থাপনা গড়ে উঠেছে।
ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের কলোনাইজেশন অ্যান্ড ওয়াল রেজিস্ট্যান্স কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত ‘সরকারি জমি’ ঘোষণার মাধ্যমে প্রায় ২৯ হাজার ৩৩৫ দুনাম ফিলিস্তিনি জমি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। সংস্থাটির মতে, অসলো চুক্তির পর ভূমি দখলের অন্যতম বড় ঘটনা এটি। একই প্রতিবেদনে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুসালেমে ১৮ হাজারের বেশি নতুন বসতি স্থাপনের অনুমোদন বা পরিকল্পনা চূড়ান্ত হওয়ার তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।
জমি দখলের পাশাপাশি পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের ওপর সহিংসতার ঘটনাও অব্যাহত রয়েছে। জাতিসংঘ ২০০৫ সালে ফিলিস্তিনি হতাহতের হিসাব রাখা শুরু করার পর ২০২৩ সাল পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনিদের জন্য সবচেয়ে প্রাণঘাতী বছর ছিল।
নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৫ সালে ইসরাইলি বাহিনী ও উগ্র বসতি স্থাপনকারীরা ফিলিস্তিনি জনগণ এবং তাঁদের সম্পত্তির ওপর ২৩ হাজার ৮২৭টি হামলা চালিয়েছে। ২০২৬ সালের প্রথম সাত মাসে উগ্র বসতি স্থাপনকারীদের হামলার হার আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৬৩ শতাংশ বেড়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এসব সহিংসতার লক্ষ্য শুধু ফিলিস্তিনিদের শাস্তি দেওয়া নয়; বরং তাঁদের কৃষিজমি দখল, বসতির সীমানা সম্প্রসারণ এবং অহিংস প্রতিরোধের পথ সংকুচিত করাও এর অংশ।
গাজা নিয়ে ইসরাইলি রাজনীতিতে অবস্থান
গাজার ভবিষ্যৎ নিয়েও ইসরাইলের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। তবে ফিলিস্তিনিদের প্রতি নীতির ক্ষেত্রে এসব পার্থক্য কতটা মৌলিক, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন নিবন্ধের লেখক।
ইসরাইলের সাবেক সেনাপ্রধান ও ইয়াশার পার্টির নেতা গাদি আইজেনকোটকে নেতানিয়াহুর তুলনায় উদারপন্থী বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু তিনি পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন বলে নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে।
আইজেনকোট গাজায় হামাসের শাসনের অবসান ঘটানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তাঁর পরিকল্পনায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবিত কাঠামো অনুসরণ করা হোক কিংবা সামরিক অভিযান অব্যাহত থাকুক—ক্ষমতায় আসার ১৮ মাসের মধ্যে এ লক্ষ্য অর্জনের কথা বলা হয়েছে।
অন্যদিকে, ইয়েশ আতিদ পার্টির প্রধান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইয়ার লাপিদ গাজাকে ১৫ বছরের জন্য মিসরের প্রশাসনের অধীনে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেটও ফিলিস্তিনি দলগুলোকে সম্পূর্ণ নিরস্ত্র না করা পর্যন্ত গাজায় ইসরাইলের সামরিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার পক্ষে মত দিয়েছেন।
নিবন্ধের লেখকের মতে, এসব নেতার মধ্যে বিরোধের মূল জায়গা ফিলিস্তিনের প্রতি নীতি নয়; বরং একই লক্ষ্য অর্জনের কৌশল।
ইসরাইলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি বনাম ফিলিস্তিন প্রশ্ন
ইসরাইলের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আরও কয়েকটি বিষয়ে বড় ধরনের মতবিরোধ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে অতি-ধর্মীয় ইহুদিদের বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগ, বিচার বিভাগীয় সংস্কার এবং ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের নিরাপত্তা ব্যর্থতার জবাবদিহি।
তবে এসব অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিরোধের সঙ্গে ফিলিস্তিনিদের অধিকার ও নিরাপত্তার প্রশ্নকে এক করে দেখার সুযোগ নেই বলে মনে করেন নিবন্ধের লেখক।
তাঁর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, নেতানিয়াহু আবারও ডানপন্থী জোট গঠন করতে পারলে দখলদারিত্ব, বসতি সম্প্রসারণ ও সামরিক আগ্রাসনের নীতি আরও জোরদার হতে পারে। অন্যদিকে, মধ্য-বামপন্থী বা উদারপন্থী জোট ক্ষমতায় এলেও বিচার বিভাগ কিংবা সামরিক নিয়োগের মতো অভ্যন্তরীণ বিষয়ে পরিবর্তন আনতে পারে; কিন্তু ফিলিস্তিনিদের ওপর নিপীড়ন ও দখলদারিত্বের ক্ষেত্রে বড় ধরনের পরিবর্তনের নিশ্চয়তা নেই।
লেখকের আশঙ্কা, তুলনামূলক উদারপন্থী সরকার ক্ষমতায় এলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরাইল নিজেদের সংস্কারক ও শান্তিকামী রাষ্ট্র হিসেবে তুলে ধরতে পারে। কিন্তু বাস্তবে বসতি সম্প্রসারণ ও দখলদারিত্ব অব্যাহত থাকলে সেই ভাবমূর্তি ফিলিস্তিনিদের পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটাবে না।
সব মিলিয়ে নিবন্ধের মূল বক্তব্য হলো, ইসরাইলের নির্বাচনে সরকার পরিবর্তনই ফিলিস্তিনিদের জন্য নীতিগত পরিবর্তনের নিশ্চয়তা নয়। তাই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত নতুন সরকারের বক্তব্যের পাশাপাশি পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণ, জমি দখল, সামরিক অভিযান এবং গাজায় মানবিক পরিস্থিতি মোকাবিলায় তাদের বাস্তব পদক্ষেপ পর্যবেক্ষণ করা।
উপজেলা পরিষদ মার্কেট, (২য় তলা) রুম নং-২৩, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ৬৩০০
২০২৫ © দৈনিক অধিকার কতৃক সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত