আগে কোনো প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে মানুষ বই পড়ত, আলোচনা করত, তর্কে জড়াত, ভুল করে শিখত। এখন কয়েকটি শব্দ লিখলেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) উত্তর, বিশ্লেষণ, এমনকি সিদ্ধান্তের পরামর্শও সামনে এনে দিচ্ছে। কাজ সহজ হচ্ছে, সময়ও বাঁচছে। কিন্তু এই সুবিধার আড়ালে একটি প্রশ্ন জোরালো হচ্ছে: আমরা কি প্রযুক্তিকে চিন্তার সহায়ক হিসেবে ব্যবহার করছি, নাকি নিজের চিন্তার দায়িত্বই তার হাতে তুলে দিচ্ছি?
প্রযুক্তি মানুষের শ্রম কমাবে, এটাই স্বাভাবিক। তবে শ্রমের সঙ্গে চিন্তার অনুশীলনও কমে গেলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় বিচারবোধ। কারণ চিন্তা মানে শুধু উত্তর পাওয়া নয়। তথ্য যাচাই, যুক্তি বিশ্লেষণ, বিকল্প বিবেচনা এবং সিদ্ধান্তের পক্ষে-বিপক্ষে প্রমাণ খোঁজার মধ্য দিয়েই স্বাধীন চিন্তা গড়ে ওঠে।
এআইয়ের উত্তর সাবলীল হতে পারে, কিন্তু সাবলীলতা মানেই নির্ভুলতা নয়। এআই ভুল তথ্যও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে উপস্থাপন করতে পারে, অসম্পূর্ণ তথ্যের ওপর ভিত্তি করে বিভ্রান্তিকর পরামর্শ দিতে পারে। যাচাই ছাড়া তা গ্রহণ করলে ভুল সিদ্ধান্তের দায় শেষ পর্যন্ত ব্যবহারকারীকেই নিতে হয়। স্বাস্থ্য, আইন ও অর্থনীতির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে অন্ধ নির্ভরতা তাই বিশেষ ঝুঁকিপূর্ণ।
শিক্ষাঙ্গনে সমস্যাটি আরও স্পষ্ট। কোনো শিক্ষার্থী যদি প্রতিটি রচনা, প্রতিবেদন বা সমস্যার সমাধান এআই দিয়ে করিয়ে নেয়, তাহলে কাজ মানসম্মত হলেও তার নিজের শেখা কতটুকু হয়? তৈরি উত্তর চিন্তার পরিশ্রম কমায় এবং যুক্তি গড়ে তোলার অনুশীলনকেও সীমিত করে। অথচ শিক্ষার উদ্দেশ্য শুধু উত্তর দেওয়া নয়, প্রশ্ন করতে শেখা, প্রমাণ যাচাই করা এবং অর্জিত জ্ঞান নতুন পরিস্থিতিতে কাজে লাগানো।
তবে এআই নিজে শিক্ষার অন্তরায় নয়। কঠিন বিষয় বুঝতে, লেখার দুর্বলতা চিহ্নিত করতে কিংবা নতুন ধারণা পেতে এটি কার্যকর সহায়ক হতে পারে। পার্থক্য গড়ে দেয় ব্যবহারের ধরন। উত্তর যাচাই করে নিজের ভাষায় ব্যাখ্যা করা শেখার অংশ, আর তৈরি কাজ নিজের বলে চালিয়ে দেওয়া শেখার বিকল্প হতে পারে না।
কর্মক্ষেত্রেও প্রতিবেদন, উপস্থাপনা ও প্রাথমিক বিশ্লেষণে এআই সময় বাঁচায়। কিন্তু এর দেওয়া তথ্য যাচাই না করে সিদ্ধান্ত নিলে দক্ষতার বদলে ভুলের ঝুঁকি বাড়ে। প্রযুক্তি তথ্য সাজিয়ে দিতে পারে, কিন্তু বাস্তব প্রেক্ষাপট, নৈতিকতা ও সিদ্ধান্তের সামাজিক পরিণতি বিবেচনার দায়িত্ব মানুষেরই।
দৈনন্দিন জীবনেও লেখা, মতামত ও সিদ্ধান্তের জন্য আমরা ক্রমেই তৈরি উত্তরের ওপর ভরসা করছি। এতে ভাষা পরিশীলিত হলেও নিজের অভিজ্ঞতা থেকে চিন্তা গড়ে তোলার অভ্যাস দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা থাকে। অথচ দ্বিধা, ভুল ও অসম্পূর্ণ ভাবনার মধ্য দিয়েই মৌলিক ধারণার জন্ম হয়। প্রতিটি ভাবনার জন্য সঙ্গে সঙ্গে নিখুঁত উত্তর খুঁজতে গেলে চিন্তার স্বাভাবিক বিকাশ বাধা পেতে পারে।
মানুষ যখন প্রশ্ন, যুক্তি ও সিদ্ধান্তের জন্য সব সময় অন্যের তৈরি উত্তরে নির্ভর করে, তখন তথ্যের প্রাচুর্য থাকলেও বিচার করার স্বাধীনতা কমে যেতে পারে। সে মতামত দেবে, কিন্তু তার ভিত্তি ব্যাখ্যা করতে পারবে না; উত্তর পাবে, কিন্তু তার যথার্থতা যাচাই করতে পারবে না।
সমাধান এআই নিষিদ্ধ করা নয়, বরং দায়িত্বশীল ব্যবহার নিশ্চিত করা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীর নিজস্ব বিশ্লেষণ ও যুক্তি ব্যাখ্যার সক্ষমতা যাচাই করতে হবে। কর্মক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের আগে এআইয়ের তথ্য ও সুপারিশ পর্যালোচনা করা জরুরি। ব্যবহারকারীকেও বুঝতে হবে, কোথায় প্রযুক্তির সহায়তাই যথেষ্ট আর কোথায় স্বাধীন যাচাই অপরিহার্য।
এআইয়ের যুগে মানুষের শক্তি সব প্রশ্নের উত্তর জানা নয়; বরং সঠিক প্রশ্ন করা, ভুল উত্তর শনাক্ত করা এবং নিজের সিদ্ধান্তের দায় নেওয়া। এআই আমাদের হয়ে ভাবতে পারে, কিন্তু আমাদের চিন্তার দায় নিতে পারে না। প্রযুক্তিকে চিন্তার সহকারী করা অগ্রগতি, আর নিজের চিন্তার বিকল্প বানানো আত্মসমর্পণ।
উপজেলা পরিষদ মার্কেট, (২য় তলা) রুম নং-২৩, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ৬৩০০
২০২৫ © দৈনিক অধিকার কতৃক সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত