ফ্রান্সে আগামী ৩১ অক্টোবরের বিক্ষোভ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সরকার ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। বিক্ষোভকারীদের শহরের কেন্দ্রস্থলের পরিবর্তে প্রান্তবর্তী এলাকায় মিছিল করার নির্দেশ দিয়েছে প্রশাসন। এ সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ শ্রমিক সংগঠন, শিক্ষার্থী ও সামাজিক আন্দোলনের কর্মীরা। তাঁদের অভিযোগ, নিরাপত্তার অজুহাতে প্রতিবাদের অধিকার সীমিত করার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের কাছ থেকে আন্দোলনকে আড়াল করার চেষ্টা করছে সরকার।
গত ১৭ অক্টোবরের পর থেকে প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁর সরকার বিক্ষোভ আয়োজনের ক্ষেত্রে নতুন অবস্থান নিয়েছে। সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী, এখন থেকে কেবল ট্রেড ইউনিয়ন বা শ্রমিক সংগঠনগুলোর আয়োজিত বিক্ষোভের অনুমতি দেওয়া হবে। তবে সেসব কর্মসূচিও শহরের কেন্দ্রস্থলের বাইরে বিকল্প পথে আয়োজন করতে হবে।
সরকারের দাবি, সাম্প্রতিক বিক্ষোভে বিভিন্ন দোকানপাট ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর, লুটপাট ও সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনা প্রতিরোধ এবং ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তবে আন্দোলনকারীরা সরকারের এ পদক্ষেপ মেনে নিতে পারছেন না। তাঁদের মতে, বিক্ষোভ শুধু রাস্তায় মানুষের উপস্থিতি নয়; বরং জনগণের সামনে নিজেদের দাবি ও অসন্তোষ তুলে ধরার গুরুত্বপূর্ণ গণতান্ত্রিক মাধ্যম। শহরের প্রাণকেন্দ্র থেকে বিক্ষোভ সরিয়ে নেওয়া হলে সাধারণ মানুষের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের যোগাযোগ কমবে। পাশাপাশি সংবাদমাধ্যমের মনোযোগ ও আন্দোলনের সামাজিক প্রভাবও হ্রাস পেতে পারে।
২৭ বছর বয়সী গ্রাফিক ডিজাইনার নিনা আগামী শনিবারের বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তবে প্রশাসনের নির্ধারিত পথ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘এরপর কী হবে? আমাদের কি শেষ পর্যন্ত বোয়া দ্য বুলোনের জঙ্গলে নিয়ে যাওয়া হবে, যাতে আমরা একেবারেই মানুষের চোখের আড়ালে চলে যাই?’
নিনার বক্তব্যে আন্দোলনকারীদের ক্ষোভ ও হতাশার চিত্র ফুটে উঠেছে। তাঁদের আশঙ্কা, এভাবে একের পর এক বিক্ষোভের স্থান পরিবর্তন করা হলে ভবিষ্যতে শহরের গুরুত্বপূর্ণ ও জনবহুল এলাকায় প্রতিবাদ কর্মসূচি আয়োজন কঠিন হয়ে পড়বে।
প্যারিসে বিক্ষোভের পথ নিয়ে বিরোধ
রাজধানী প্যারিসে বিক্ষোভের স্থান নির্ধারণ নিয়ে প্রশাসন ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে কয়েক দফা মতবিরোধ হয়েছে। প্রথমে বিক্ষোভকারীরা বাস্তিল চত্বর থেকে নাসিওঁ পর্যন্ত মিছিল করার পরিকল্পনা করেন। প্যারিস পুলিশ প্রিফেকচারও প্রাথমিকভাবে এ প্রস্তাবে সম্মতি দিয়েছিল।
কিন্তু পরে প্রশাসন সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে। বিক্ষোভের আগের দিন বাস্তিল-নাসিওঁ পথের পরিবর্তে পোর্ত দ্য ইতালি থেকে পোর্ত দ্য ভিনসেন পর্যন্ত বিকল্প পথ নির্ধারণ করা হয়। এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আন্দোলনকারীরা আপত্তি জানালে বিষয়টি প্রশাসনিক আদালত পর্যন্ত গড়ায়। তবে বিক্ষোভের দিন আদালত প্রশাসনের নির্ধারিত বিকল্প পথের বৈধতা বহাল রাখে।
আগামী ৩১ অক্টোবরের কর্মসূচি নিয়েও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ইল-দ্য-ফ্রান্স অঞ্চলের শ্রমিক সংগঠনগুলোর সমন্বিত জোট (ইন্টারসিন্ডিকাল) বাস্তিল থেকে নাসিওঁ পর্যন্ত মিছিলের অনুমতি চেয়ে আবেদন করে। কিন্তু প্রশাসন সেই প্রস্তাব গ্রহণ না করে পোর্ত দ্য বাগনোলে থেকে পোর্ত দ্য শারঁতঁ পর্যন্ত বিকল্প পথে বিক্ষোভ আয়োজনের প্রস্তাব দিয়েছে।
বারবার বিক্ষোভের পথ পরিবর্তনের সিদ্ধান্তে আন্দোলনকারীদের মধ্যে ক্ষোভ আরও বেড়েছে। তাঁদের মতে, এ ধরনের পদক্ষেপ আন্দোলনের স্বাভাবিক ধারাবাহিকতা ব্যাহত করছে।
বিকল্প পথ মানতে নারাজ শিক্ষার্থীদের একাংশ
শ্রমিক সংগঠনগুলোর পাশাপাশি শিক্ষার্থী সংগঠনগুলোর মধ্যেও প্রশাসনের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জোরালো হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিক্ষার্থী সংগঠন ইন্টারফ্যাক আইডিএফ প্রশাসনের সঙ্গে কোনো ধরনের সমঝোতা ছাড়াই বাস্তিল চত্বর থেকে বিক্ষোভ মিছিল শুরু করার আহ্বান জানিয়েছে।
সংগঠনটির এ অবস্থান থেকে বোঝা যাচ্ছে, আন্দোলনকারীদের একটি অংশ প্রশাসনের নির্ধারিত বিকল্প পথ মেনে নিতে আগ্রহী নয়। তারা শহরের কেন্দ্রস্থলেই বিক্ষোভ আয়োজনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে শ্রমিক সংগঠন, শিক্ষার্থী ও সামাজিক আন্দোলনের কর্মীদের মধ্যে সমন্বয় ও ঐক্যের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা করে কর্মসূচি পালন করা হবে, নাকি নির্ধারিত পথ উপেক্ষা করে প্রতিবাদ জানানো হবে—তা নিয়ে আন্দোলনকারীদের মধ্যে ভিন্ন অবস্থান তৈরি হতে পারে।
নিরাপত্তা ও প্রতিবাদের অধিকার নিয়ে বিতর্ক
ফরাসি সরকারের অবস্থান হলো, বিক্ষোভের সময় সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সুরক্ষা এবং শহরের স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখা জরুরি। অতীতে বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে দোকানপাটে ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটায় প্রশাসন সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। এ কারণেই শহরের কেন্দ্রস্থলের পরিবর্তে বিকল্প এলাকায় বিক্ষোভ আয়োজনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
অন্যদিকে আন্দোলনকারীদের বক্তব্য, বিচ্ছিন্ন কিছু সহিংস ঘটনার দায়ে সব বিক্ষোভকারীকে একইভাবে বিবেচনা করা উচিত নয়। তাঁদের মতে, শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ জানানো এবং নিজেদের দাবি জনগণের সামনে তুলে ধরার অধিকার গণতান্ত্রিক সমাজের অন্যতম মৌলিক অধিকার।
আন্দোলনকারীদের যুক্তি, শহরের কেন্দ্রস্থল সাধারণ মানুষের চলাচল, গণপরিবহন, সংবাদমাধ্যম এবং গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ও বাণিজ্যিক স্থাপনার কেন্দ্র। এসব এলাকায় বিক্ষোভ হলে আন্দোলনের বক্তব্য বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছানো সম্ভব হয়। বিপরীতে শহরের প্রান্তে কর্মসূচি সীমাবদ্ধ থাকলে আন্দোলনের প্রভাব কমে যেতে পারে।
আগামী ৩১ অক্টোবরের কর্মসূচি ফ্রান্সের সামাজিক আন্দোলনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হয়ে উঠেছে। একদিকে প্রশাসন বিকল্প পথে বিক্ষোভ আয়োজনের বিষয়ে অনড়, অন্যদিকে আন্দোলনকারীদের একটি অংশ শহরের কেন্দ্রস্থল ছাড়তে নারাজ। বিশেষ করে শিক্ষার্থী সংগঠনের পক্ষ থেকে বাস্তিল চত্বর থেকে মিছিলের আহ্বান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
বিক্ষোভের দিন প্রশাসন কী ধরনের নিরাপত্তাব্যবস্থা নেয় এবং আন্দোলনকারীরা শেষ পর্যন্ত কোন পথে কর্মসূচি পালন করেন, তা নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
পরিস্থিতি বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, বিক্ষোভের স্থান নির্ধারণ নিয়ে বিরোধটি ফ্রান্সে নাগরিকদের প্রতিবাদের অধিকার, জননিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের সীমা নিয়ে বৃহত্তর বিতর্কের অংশ হয়ে উঠেছে। সরকার ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে সমঝোতা না হলে এ নিয়ে অসন্তোষ আরও বাড়তে পারে।
উপজেলা পরিষদ মার্কেট, (২য় তলা) রুম নং-২৩, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ৬৩০০
২০২৫ © দৈনিক অধিকার কতৃক সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত