
দেশজুড়ে একের পর এক কন্যাশিশু ধর্ষণ ও ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় ক্ষোভে ফুঁসে উঠেছে সাধারণ মানুষ। শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ, হত্যা ও বিচারহীনতার বিরুদ্ধে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় রোববার বিক্ষোভ, মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। “আর না”— এই প্রতিপাদ্য সামনে রেখে আয়োজিত কর্মসূচিগুলোতে নারী, শিশু, শিক্ষার্থী, নাগরিক সমাজ, সাংস্কৃতিক কর্মী ও মানবাধিকার সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
বক্তারা বলেন, একটি সভ্য রাষ্ট্রের পরিচয় নির্ভর করে নারী ও শিশুর নিরাপত্তার ওপর। অথচ দেশে একের পর এক কন্যাশিশু ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হলেও অনেক ক্ষেত্রে বিচার বিলম্বিত হচ্ছে, যা অপরাধীদের আরও বেপরোয়া করে তুলছে। তারা দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানান।
শাহবাগে ‘আর না’ সমাবেশ
রোববার বিকেলে রাজধানীর শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে ‘আর না’ শিরোনামে এক প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এতে অংশ নেয় নেটওয়ার্ক ফর পিপলস অ্যাকশন (এনপিএ), গণবিপ্লবী উদ্যোগ, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সাবেক কয়েকজন নেতা, বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন, নাগরিক আন্দোলনকারী ও বিভিন্ন বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।
সমাবেশে বক্তারা বলেন, “একটি আট বছরের শিশু যদি ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হয়, তাহলে সেটি শুধু একটি পরিবারের ট্র্যাজেডি নয়— এটি পুরো সমাজ ও রাষ্ট্রের ব্যর্থতা।” তারা বলেন, “শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ, কর্তৃপক্ষের অবহেলা ও বিচারহীনতা— আর না।”
বক্তারা আরও বলেন, শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শুধু আইন করলেই হবে না; পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সমাজ ও রাষ্ট্রকে একযোগে দায়িত্ব নিতে হবে। অপরাধীদের রাজনৈতিক বা সামাজিক পরিচয় বিবেচনা না করে দ্রুত আইনের আওতায় আনারও দাবি জানানো হয়।
নারী সাংবাদিকদের উদ্বেগ
কন্যাশিশু ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ নারী সাংবাদিক কেন্দ্র (বিএনএসকে)। রোববার দুপুরে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে সংগঠনটির উদ্যোগে আয়োজিত মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, দেশে শিশু ও নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।
সংগঠনের সভাপতি নাসিমুন আরা হক মিনুর সভাপতিত্বে আয়োজিত এ কর্মসূচিতে পল্লবীর শিশু হত্যাসহ দেশের সব শিশু ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার এবং দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানানো হয়।
বক্তারা বলেন, “প্রতিটি ঘটনার পর কিছুদিন আলোচনা হয়, তারপর সব চাপা পড়ে যায়। এই সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে। বিচারহীনতার কারণেই অপরাধ বাড়ছে।”
ঢাকার বাইরে প্রতিবাদের ঢেউ
রাজধানীর পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলাতেও শিশু ধর্ষণ ও হত্যার প্রতিবাদে বিক্ষোভ ও মানববন্ধন হয়েছে।
নাটোরের সিংড়ায় পল্লবীতে শিশু ধর্ষণ ও হত্যা মামলার প্রধান আসামি সোহেলের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে মানববন্ধন করে পল্লী কল্যাণ শিক্ষা সোসাইটি। বক্তারা বলেন, “শিশু হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হলে সমাজে ভয়াবহ বার্তা যাবে।”
রংপুর প্রেস ক্লাবের সামনে নাগরিক প্ল্যাটফর্মের উদ্যোগে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। মৌলভীবাজারে শেখ বোরহান উদ্দিন (রহ.) ইসলামী সোসাইটি (বিআইএস) ব্যতিক্রমধর্মী প্রতিবাদ হিসেবে শিশু হত্যার ঘটনায় প্রতীকীভাবে জুতা নিক্ষেপ কর্মসূচি পালন করে।
কুড়িগ্রাম প্রেস ক্লাবের সামনে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা এফএডি ও মহিদেব যুব সমাজকল্যাণ সমিতির যৌথ উদ্যোগে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে বক্তারা বলেন, শিশুদের জন্য নিরাপদ সমাজ গড়ে তুলতে হলে সামাজিক সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি কঠোর আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
কিশোরগঞ্জের নিকলীতে জেন্ডার সমতা ও জলবায়ু জোট মানববন্ধনের আয়োজন করে। নারায়ণগঞ্জ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে মানববন্ধন করে নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোট। এতে বক্তব্য দেন সংগঠনের উপদেষ্টা রফিউর রাব্বি ও জাহিদুল হক দীপু।
মানিকগঞ্জ প্রেস ক্লাবের সামনে জেলা নারী ও কিশোরী উন্নয়ন ফোরাম, বারসিক, পাসা এবং এনজিও ফেডারেশনের যৌথ উদ্যোগে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়।
অন্যদিকে বরিশালে অশ্বিনী কুমার হলের সামনে কয়েকশ শিশু অংশ নেয় এক ব্যতিক্রমধর্মী মানববন্ধনে। সেখানে শিশুরা হাতে প্ল্যাকার্ড নিয়ে শিশু ধর্ষণ ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানায় এবং নিরাপদ শৈশব নিশ্চিতের দাবি তোলে।
“শুধু প্রতিবাদ নয়, কার্যকর পদক্ষেপ চাই”
মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, কেবল প্রতিবাদ কর্মসূচি নয়— শিশু সুরক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি কার্যকর পরিকল্পনা জরুরি। তারা স্কুলভিত্তিক সচেতনতা, পরিবারে নৈতিক শিক্ষা, দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের কার্যকারিতা বৃদ্ধি এবং যৌন অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর নজরদারির দাবি জানিয়েছেন।
সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করছেন, শিশু নির্যাতনের মতো ভয়াবহ অপরাধ বন্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। কারণ বিচারহীনতা ও সামাজিক নীরবতা অপরাধীদের আরও সাহসী করে তুলছে।
দৈনিক অধিকার ডেস্ক 























