ঢাকা ০১:৫৪ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৫ মে ২০২৬, ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
[gtranslate]

বাম্পার ফলন, তবু কৃষকের চোখে হতাশা

লোকসানে হাজারো কৃষক।

রাজশাহীসহ উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বিস্তীর্ণ জনপদজুড়ে এবার বোরো ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। মাঠজুড়ে সোনালি ধানের সমারোহ দেখে কৃষকের মুখে হাসি ফুটার কথা থাকলেও বাস্তবতা যেন উল্টো। উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ার পরও বাজারে মিলছে না কাঙ্ক্ষিত দাম। ফলে বিঘাপ্রতি দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা পর্যন্ত লোকসান গুনতে হচ্ছে কৃষকদের। অনেকের অভিযোগ, বড় কোম্পানির এজেন্টদের সিন্ডিকেটের কারণে ধানের বাজারে কৃত্রিমভাবে দাম কমিয়ে রাখা হয়েছে।

কৃষকরা বলছেন, একদিকে বাড়তি সেচ খরচ, সার, কীটনাশক ও শ্রমিকের মজুরি; অন্যদিকে বাজারে ধানের কম দাম— দুই চাপে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন তারা। বাম্পার ফলনও যেন তাদের জন্য আশীর্বাদ নয়, বরং নতুন দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

উৎপাদন খরচ বাড়লেও বাড়েনি দাম

কৃষি বিভাগ ও কৃষকদের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে প্রতি বিঘা বোরো আবাদে জমি প্রস্তুত, বীজ, সার, সেচ, কীটনাশক ও শ্রমিক মজুরি মিলিয়ে খরচ হয়েছে প্রায় ২০ থেকে ২২ হাজার টাকা। ধান কাটা, মাড়াই ও ঘরে তুলতে আরও ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে। সব মিলিয়ে বিঘাপ্রতি মোট উৎপাদন খরচ দাঁড়িয়েছে ২৬ থেকে ২৭ হাজার টাকা।

অন্যদিকে প্রতি বিঘায় ফলন হয়েছে গড়ে ২০ থেকে ২২ মন। কিন্তু বর্তমান বাজারে প্রতি মন ধান বিক্রি হচ্ছে মাত্র ১ হাজার ১২০ থেকে ১ হাজার ২৫০ টাকা দরে। এতে বিঘাপ্রতি আয় হচ্ছে সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকার কিছু বেশি। অর্থাৎ প্রতিটি বিঘায় কৃষকদের অন্তত দুই হাজার টাকা পর্যন্ত লোকসান গুনতে হচ্ছে।

“ধান বিক্রি করে ঋণই শোধ হচ্ছে না”

রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলার কামারপাড়া গ্রামের কৃষক জয়নাল আবেদিন বলেন, “সাড়ে তিন বিঘা জমিতে বোরো আবাদ করতে আমার মোট খরচ হয়েছে ১ লাখ ৩ হাজার টাকা। ৭৩ মন ধান বিক্রি করে পেয়েছি মাত্র ৯১ হাজার ২৫০ টাকা। প্রায় ১২ হাজার টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে। এখন ধান বিক্রি করে ঋণই শোধ হচ্ছে না।”

নওগাঁর মান্দা উপজেলার কৃষক আব্দুর রাজ্জাক বলেন, “আগে এলাকায় ছোট ছোট অনেক চাতাল ছিল। তারা সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে ধান কিনতো। এখন বড় কোম্পানির দাপটে ছোট চাতাল বন্ধ হয়ে গেছে। বাধ্য হয়ে কোম্পানির এজেন্টদের কাছে কম দামে ধান বিক্রি করতে হচ্ছে।”

রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার কৃষক আব্দুল মান্নান বলেন, “উৎপাদন খরচ কয়েকগুণ বেড়েছে, কিন্তু ধানের দাম বাড়েনি। কৃষকের ঘাম ঝরানো ফসলের ন্যায্যমূল্য না পেলে কৃষি টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে যাবে।”

চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল উপজেলার কৃষক আব্দুল খালেক জানান, “ডিজেলের দাম বাড়ায় সেচ খরচ বেড়েছে। সার ও কৃষি উপকরণের দামও বেশি। অথচ স্থানীয় হাটে ধান বিক্রি করেছি মাত্র ১ হাজার ১২০ টাকা মন দরে।”

সিন্ডিকেটের কবলে ধানের বাজার?

কৃষকদের অভিযোগ, উত্তরাঞ্চলের বড় মোকামগুলোতে কয়েকটি কোম্পানির এজেন্ট সিন্ডিকেট করে ধানের দাম নিয়ন্ত্রণ করছে। প্রতি হাটবারে তারা নিজেদের মধ্যে সমন্বয় করে দাম নির্ধারণ করে দেয়। ফলে বাজারে প্রতিযোগিতা কমে গেছে এবং কৃষকরা ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

কেশরহাটের কৃষক নুর ইসলাম বলেন, “ধান ওঠার মৌসুমে ইচ্ছাকৃতভাবে দাম কমিয়ে দেওয়া হয়। মধ্যস্বত্বভোগীরা কম দামে ধান কিনে মজুত করে রাখে। কয়েক মাস পর বেশি দামে বিক্রি করে তারাই লাভবান হয়, কৃষক নয়।”

কৃষকদের দাবি, সরকারিভাবে বাজার তদারকি বাড়ানো না হলে এবং সিন্ডিকেট ভাঙা না গেলে কৃষকরা আরও বড় ক্ষতির মুখে পড়বেন।

সরকারি গুদামে ধান বিক্রিতেও জটিলতা

গত ১৫ মে থেকে রাজশাহীসহ উত্তরাঞ্চলের সরকারি খাদ্য গুদামগুলোতে ধান-চাল সংগ্রহ অভিযান শুরু হয়েছে। সরকার প্রতি কেজি ধান ৩৬ টাকা বা প্রতি মন ১ হাজার ৪৪০ টাকা দরে ধান কিনছে, যা বাজারদরের চেয়ে প্রায় ৩০০ টাকা বেশি।

তবে কৃষকদের অভিযোগ, বাস্তবে সাধারণ কৃষকরা সহজে সরকারি গুদামে ধান বিক্রি করতে পারছেন না। নিবন্ধন, পরিবহন ও নানা প্রক্রিয়াগত জটিলতার কারণে অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে কম দামে স্থানীয় বাজারে ধান বিক্রি করছেন।

আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক সাইফুদ্দিন বলেন, “সরকার সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকেই ধান কিনতে চায়। তবে কিছু প্রক্রিয়াগত কারণে অনেক কৃষক গুদামে আসতে আগ্রহী হন না। বিষয়টি সহজ করতে কাজ চলছে।”

“ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত না হলে কৃষি হুমকিতে পড়বে”

কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ ড. আব্দুল মজিদ জানান, “হাওড় অঞ্চলে কিছু ক্ষতি হলেও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে বোরোর বাম্পার ফলন হয়েছে। উৎপাদন খরচ কিছুটা বেড়েছে ঠিকই, তবে সরকারের সংগ্রহ কার্যক্রম জোরদার হলে বাজারে ধানের দাম বাড়বে বলে আশা করছি।”

তবে কৃষি অর্থনীতিবিদরা বলছেন, শুধু সরকারি ঘোষণা নয়— বাস্তবে কৃষকের হাতে ন্যায্যমূল্য পৌঁছানোই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। ধানের বাজারে মধ্যস্বত্বভোগী ও সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ না করলে কৃষক ক্রমেই কৃষি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারেন।

কৃষকদের দাবি, দ্রুত বাজার মনিটরিং জোরদার, সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান ক্রয় বৃদ্ধি, সহজ শর্তে সরকারি গুদামে ধান বিক্রির সুযোগ এবং কৃষি উপকরণের দাম নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। তা না হলে বাম্পার ফলনের আনন্দও কৃষকের জীবনে স্বস্তি বয়ে আনবে না।

জনপ্রিয় সংবাদ

বাম্পার ফলন, তবু কৃষকের চোখে হতাশা

প্রকাশের সময়ঃ ০১:৫৩:২৩ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৫ মে ২০২৬

রাজশাহীসহ উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বিস্তীর্ণ জনপদজুড়ে এবার বোরো ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। মাঠজুড়ে সোনালি ধানের সমারোহ দেখে কৃষকের মুখে হাসি ফুটার কথা থাকলেও বাস্তবতা যেন উল্টো। উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ার পরও বাজারে মিলছে না কাঙ্ক্ষিত দাম। ফলে বিঘাপ্রতি দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা পর্যন্ত লোকসান গুনতে হচ্ছে কৃষকদের। অনেকের অভিযোগ, বড় কোম্পানির এজেন্টদের সিন্ডিকেটের কারণে ধানের বাজারে কৃত্রিমভাবে দাম কমিয়ে রাখা হয়েছে।

কৃষকরা বলছেন, একদিকে বাড়তি সেচ খরচ, সার, কীটনাশক ও শ্রমিকের মজুরি; অন্যদিকে বাজারে ধানের কম দাম— দুই চাপে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন তারা। বাম্পার ফলনও যেন তাদের জন্য আশীর্বাদ নয়, বরং নতুন দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

উৎপাদন খরচ বাড়লেও বাড়েনি দাম

কৃষি বিভাগ ও কৃষকদের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে প্রতি বিঘা বোরো আবাদে জমি প্রস্তুত, বীজ, সার, সেচ, কীটনাশক ও শ্রমিক মজুরি মিলিয়ে খরচ হয়েছে প্রায় ২০ থেকে ২২ হাজার টাকা। ধান কাটা, মাড়াই ও ঘরে তুলতে আরও ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে। সব মিলিয়ে বিঘাপ্রতি মোট উৎপাদন খরচ দাঁড়িয়েছে ২৬ থেকে ২৭ হাজার টাকা।

অন্যদিকে প্রতি বিঘায় ফলন হয়েছে গড়ে ২০ থেকে ২২ মন। কিন্তু বর্তমান বাজারে প্রতি মন ধান বিক্রি হচ্ছে মাত্র ১ হাজার ১২০ থেকে ১ হাজার ২৫০ টাকা দরে। এতে বিঘাপ্রতি আয় হচ্ছে সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকার কিছু বেশি। অর্থাৎ প্রতিটি বিঘায় কৃষকদের অন্তত দুই হাজার টাকা পর্যন্ত লোকসান গুনতে হচ্ছে।

“ধান বিক্রি করে ঋণই শোধ হচ্ছে না”

রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলার কামারপাড়া গ্রামের কৃষক জয়নাল আবেদিন বলেন, “সাড়ে তিন বিঘা জমিতে বোরো আবাদ করতে আমার মোট খরচ হয়েছে ১ লাখ ৩ হাজার টাকা। ৭৩ মন ধান বিক্রি করে পেয়েছি মাত্র ৯১ হাজার ২৫০ টাকা। প্রায় ১২ হাজার টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে। এখন ধান বিক্রি করে ঋণই শোধ হচ্ছে না।”

নওগাঁর মান্দা উপজেলার কৃষক আব্দুর রাজ্জাক বলেন, “আগে এলাকায় ছোট ছোট অনেক চাতাল ছিল। তারা সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে ধান কিনতো। এখন বড় কোম্পানির দাপটে ছোট চাতাল বন্ধ হয়ে গেছে। বাধ্য হয়ে কোম্পানির এজেন্টদের কাছে কম দামে ধান বিক্রি করতে হচ্ছে।”

রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার কৃষক আব্দুল মান্নান বলেন, “উৎপাদন খরচ কয়েকগুণ বেড়েছে, কিন্তু ধানের দাম বাড়েনি। কৃষকের ঘাম ঝরানো ফসলের ন্যায্যমূল্য না পেলে কৃষি টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে যাবে।”

চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল উপজেলার কৃষক আব্দুল খালেক জানান, “ডিজেলের দাম বাড়ায় সেচ খরচ বেড়েছে। সার ও কৃষি উপকরণের দামও বেশি। অথচ স্থানীয় হাটে ধান বিক্রি করেছি মাত্র ১ হাজার ১২০ টাকা মন দরে।”

সিন্ডিকেটের কবলে ধানের বাজার?

কৃষকদের অভিযোগ, উত্তরাঞ্চলের বড় মোকামগুলোতে কয়েকটি কোম্পানির এজেন্ট সিন্ডিকেট করে ধানের দাম নিয়ন্ত্রণ করছে। প্রতি হাটবারে তারা নিজেদের মধ্যে সমন্বয় করে দাম নির্ধারণ করে দেয়। ফলে বাজারে প্রতিযোগিতা কমে গেছে এবং কৃষকরা ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

কেশরহাটের কৃষক নুর ইসলাম বলেন, “ধান ওঠার মৌসুমে ইচ্ছাকৃতভাবে দাম কমিয়ে দেওয়া হয়। মধ্যস্বত্বভোগীরা কম দামে ধান কিনে মজুত করে রাখে। কয়েক মাস পর বেশি দামে বিক্রি করে তারাই লাভবান হয়, কৃষক নয়।”

কৃষকদের দাবি, সরকারিভাবে বাজার তদারকি বাড়ানো না হলে এবং সিন্ডিকেট ভাঙা না গেলে কৃষকরা আরও বড় ক্ষতির মুখে পড়বেন।

সরকারি গুদামে ধান বিক্রিতেও জটিলতা

গত ১৫ মে থেকে রাজশাহীসহ উত্তরাঞ্চলের সরকারি খাদ্য গুদামগুলোতে ধান-চাল সংগ্রহ অভিযান শুরু হয়েছে। সরকার প্রতি কেজি ধান ৩৬ টাকা বা প্রতি মন ১ হাজার ৪৪০ টাকা দরে ধান কিনছে, যা বাজারদরের চেয়ে প্রায় ৩০০ টাকা বেশি।

তবে কৃষকদের অভিযোগ, বাস্তবে সাধারণ কৃষকরা সহজে সরকারি গুদামে ধান বিক্রি করতে পারছেন না। নিবন্ধন, পরিবহন ও নানা প্রক্রিয়াগত জটিলতার কারণে অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে কম দামে স্থানীয় বাজারে ধান বিক্রি করছেন।

আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক সাইফুদ্দিন বলেন, “সরকার সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকেই ধান কিনতে চায়। তবে কিছু প্রক্রিয়াগত কারণে অনেক কৃষক গুদামে আসতে আগ্রহী হন না। বিষয়টি সহজ করতে কাজ চলছে।”

“ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত না হলে কৃষি হুমকিতে পড়বে”

কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ ড. আব্দুল মজিদ জানান, “হাওড় অঞ্চলে কিছু ক্ষতি হলেও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে বোরোর বাম্পার ফলন হয়েছে। উৎপাদন খরচ কিছুটা বেড়েছে ঠিকই, তবে সরকারের সংগ্রহ কার্যক্রম জোরদার হলে বাজারে ধানের দাম বাড়বে বলে আশা করছি।”

তবে কৃষি অর্থনীতিবিদরা বলছেন, শুধু সরকারি ঘোষণা নয়— বাস্তবে কৃষকের হাতে ন্যায্যমূল্য পৌঁছানোই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। ধানের বাজারে মধ্যস্বত্বভোগী ও সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ না করলে কৃষক ক্রমেই কৃষি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারেন।

কৃষকদের দাবি, দ্রুত বাজার মনিটরিং জোরদার, সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান ক্রয় বৃদ্ধি, সহজ শর্তে সরকারি গুদামে ধান বিক্রির সুযোগ এবং কৃষি উপকরণের দাম নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। তা না হলে বাম্পার ফলনের আনন্দও কৃষকের জীবনে স্বস্তি বয়ে আনবে না।