
পুলিশ কোনো রাজনৈতিক দলের রক্ষক নয়, বরং জনগণের করের টাকায় পরিচালিত রাষ্ট্রের কর্মচারী—এমন মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। তিনি বলেন, পুলিশ বাহিনীর প্রধান দায়িত্ব হলো জনগণের সেবা নিশ্চিত করা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা।
রোববার সকালে রাজশাহীর সারদায় বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমিতে সহকারী পুলিশ সুপারদের (এএসপি) প্রশিক্ষণ সমাপনী কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
নির্বাচনকালীন দায়িত্ব প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, মানবিক মর্যাদা ও আইনের শাসন বাস্তবায়নে মাঠপর্যায়ের পুলিশের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জনগণের আস্থা অর্জন ছাড়া কেবল শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে শান্তি বজায় রাখা সম্ভব নয়। তিনি জানান, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন করতে পুলিশ বাহিনী সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে এবং এ লক্ষ্যে প্রায় এক লাখ পুলিশ সদস্যকে বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, নির্বাচনী দায়িত্ব পালনের সময় পুলিশকে শতভাগ নিরপেক্ষ থাকতে হবে। কোনো ধরনের অনৈতিক সুবিধা বা আপ্যায়ন গ্রহণ করা যাবে না। ভোটকেন্দ্রে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হলে রিটার্নিং কর্মকর্তার পরামর্শ অনুযায়ী আইনানুগ ও দৃঢ় ব্যবস্থা নিতে হবে।
আইন প্রয়োগে সততা ও বিচক্ষণতার ওপর গুরুত্ব দিয়ে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, পুলিশের প্রকৃত শক্তি কেবল কঠোরতায় নয়, বরং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার সক্ষমতায়। তদন্ত, গ্রেপ্তার কিংবা সিদ্ধান্ত গ্রহণে কোনো রাজনৈতিক পরিচয় বা ব্যক্তিগত চাপ বিবেচনায় নেওয়া যাবে না। জনগণ এমন পুলিশ বাহিনী প্রত্যাশা করে, যারা ভয় নয়—নিরাপত্তা ও আস্থার অনুভূতি সৃষ্টি করবে।
দুর্নীতিকে রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শত্রু আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, দুর্নীতি কোনো প্রতিষ্ঠানকে ভেতর থেকে দুর্বল করে দেয় এবং জনগণের বিশ্বাস ধ্বংস করে। কোনো পুলিশ সদস্য যদি ব্যক্তিগত স্বার্থ বা রাজনৈতিক সুবিধার জন্য দায়িত্বচ্যুত হয়, তবে তা রাষ্ট্রের ভিত্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অন্যায় আদেশ বা পক্ষপাতমূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত না হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
সাহসের ব্যাখ্যায় স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, প্রকৃত সাহস শুধু বিপদের মুখে দাঁড়িয়ে থাকা নয়; বরং অন্যায় আদেশে ‘না’ বলা এবং নিপীড়িত মানুষের পক্ষে দাঁড়ানোই সত্যিকারের সাহস। সততা ও নৈতিকতাই নবীন পুলিশ কর্মকর্তাদের প্রধান পরিচয় হওয়া উচিত।
তিনি বলেন, কর্মজীবনে নানা চাপ ও সমালোচনা আসতে পারে, তবে সততা ও দেশপ্রেম থাকলে দায়িত্ব পালনে কোনো বাধাই টেকসই হতে পারে না। নবীন কর্মকর্তাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, আপনারা শুধু বর্তমানের পুলিশ নন, আপনারাই ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের পুলিশ। তাই দুর্নীতি ও পক্ষপাতিত্বমুক্ত, মানবিক ও সাহসী একটি গৌরবময় পুলিশ বাহিনী গড়ে তুলতে হবে।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব নাসিমুল গণি এবং বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমির প্রিন্সিপাল অ্যাডিশনাল আইজিপি মো. তওফিক মাহবুব চৌধুরী।
২০২৫ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া ৪১তম বিসিএস (পুলিশ) ব্যাচের মোট ৯৬ জন প্রশিক্ষণার্থী এদিন কুচকাওয়াজের মধ্য দিয়ে বাস্তব কর্মজীবনে প্রবেশ করেন। এর মধ্যে ৪১তম বিসিএসের ৮৭ জন ছাড়াও বিভিন্ন ব্যাচের আরও কয়েকজন প্রশিক্ষণার্থী অংশ নেন।
কুচকাওয়াজে প্যারেড কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করেন শিক্ষানবিশ সহকারী পুলিশ সুপার ধীমান কুমার মন্ডল। সামগ্রিক কৃতিত্বের জন্য বেস্ট প্রবেশনার নির্বাচিত হন মোহাম্মদ সাজ্জাদ হোসেন। বেস্ট একাডেমিক অ্যাওয়ার্ড পান মো. মেহেদী আরিফ, বেস্ট ইন ফিল্ড অ্যাক্টিভিটিজ অ্যাওয়ার্ড অর্জন করেন মো. সজীব হোসেন, বেস্ট হর্সম্যানশিপ অ্যাওয়ার্ড পান মোসলেহ উদ্দীন আহমেদ এবং বেস্ট শ্যুটার নির্বাচিত হন সালমান ফারুক।
প্রশিক্ষণ সমাপনী কুচকাওয়াজ শেষে নবীন সহকারী পুলিশ সুপারদের দেশের বিভিন্ন জেলায় ছয় মাসের বাস্তব প্রশিক্ষণের জন্য পদায়ন করা হবে।
সৈয়দ মাসুদ,রাজশাহী 


















