
মহান স্বাধীনতার ঘোষক, বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবর্তক, আধুনিক বাংলাদেশের অন্যতম রূপকার এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বীর-উত্তমের ৯০তম জন্মবার্ষিকী আজ সোমবার।
১৯৩৬ সালের ১৯ জানুয়ারি বগুড়া জেলার গাবতলী উপজেলার নিভৃত পল্লী বাগবাড়িতে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে তাঁর জন্ম। দূরদর্শী নেতৃত্ব, গভীর দেশপ্রেম, অসীম সাহস ও সহজ-সরল ব্যক্তিত্বের জন্য তিনি বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে স্মরণীয় হয়ে আছেন। ১৯৮১ সালে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে একদল বিপথগামী সামরিক কর্মকর্তার হাতে তিনি মর্মান্তিকভাবে শহীদ হন।
শৈশব ও কর্মজীবন
শহীদ জিয়াউর রহমানের পারিবারিক ডাকনাম ছিল কমল। তাঁর পিতা মনসুর রহমান ছিলেন তৎকালীন কেন্দ্রীয় সরকারের একজন উচ্চপদস্থ বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এবং পেশায় রসায়নবিদ। মাতা জাহানারা খাতুন। পাঁচ ভাইয়ের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয়।
১৯৫৩ সালে পাকিস্তান সামরিক একাডেমিতে অফিসার ক্যাডেট হিসেবে যোগদানের মধ্য দিয়ে তাঁর সামরিক জীবনের সূচনা। ১৯৬৭ সালের এপ্রিল মাসে ঢাকার অদূরে জয়দেবপুর সাব-ক্যান্টনমেন্টে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। একই বছর উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য তিনি পশ্চিম জার্মানি যান।
মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা
১৯৭০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে জিয়াউর রহমান চট্টগ্রামে বদলি হন এবং ষোলশহর বাজারে তাঁর ঘাঁটি স্থাপন করেন। সেখান থেকেই তিনি মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ জাতির চরম সংকটময় মুহূর্তে চট্টগ্রাম থেকে ভেসে আসে তাঁর কণ্ঠ—
“আমি মেজর জিয়া বলছি… আমি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করছি।”
এই ঘোষণায় দিশাহারা জাতি নতুন প্রেরণায় উজ্জীবিত হয়ে ওঠে এবং শুরু হয় সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ। ২৬ মার্চ থেকে ১৭ এপ্রিল পর্যন্ত তিনি স্বাধীনতা যুদ্ধের সর্বাধিনায়কের দায়িত্ব পালন করেন। পরে মুজিবনগরে প্রবাসী সরকার গঠিত হলে দায়িত্ব হস্তান্তর করা হয় কর্নেল এম এ জি ওসমানীর কাছে।
মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও নোয়াখালীর বিস্তীর্ণ অঞ্চলে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে সাহসিকতার সঙ্গে যুদ্ধ পরিচালনা করেন এবং গঠন করেন ঐতিহাসিক ‘জেড ফোর্স’। স্বাধীনতার পর তিনি পুনরায় সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে ডেপুটি চিফ অব আর্মি স্টাফের দায়িত্ব পালন করেন।
রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে উত্থান
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট-পরবর্তী রাজনৈতিক অস্থিরতার সময়ে দেশ গভীর অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে। ৩ নভেম্বর তাঁকে বন্দি করা হলেও ৭ নভেম্বর ঐতিহাসিক সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থানে তিনি মুক্ত হন। সে সময় নেতৃত্বশূন্য জাতি তাঁকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দেয়। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকটময় সময়ে তিনি দেশপ্রেম ও জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হিসেবে আবির্ভূত হন।
শাহাদাত ও জনসমর্থন
তাঁর ব্যাপক জনপ্রিয়তা ও স্বাধীনচেতা নেতৃত্বই শেষ পর্যন্ত তাঁর জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে তিনি শহীদ হন। তাঁর শাহাদাতে দেশ-বিদেশে শোকের ছায়া নেমে আসে। শেরেবাংলানগরে অনুষ্ঠিত তাঁর জানাজায় লাখো মানুষের উপস্থিতি তাঁর জনপ্রিয়তারই প্রতিফলন ছিল।
মির্জা ফখরুলের শ্রদ্ধা
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এক বাণীতে বলেন, শহীদ জিয়াউর রহমান ছিলেন একজন স্বপ্নদ্রষ্টা রাষ্ট্রনায়ক। মহান স্বাধীনতার ঘোষক, বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবক্তা, জেড ফোর্সের অধিনায়ক ও বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদী দর্শনের প্রণেতা হিসেবে তিনি ইতিহাসে অনন্য। জন্মবার্ষিকীতে তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান তিনি।
তিনি বলেন, শহীদ জিয়ার আদর্শ ধারণ করে স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা, গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা, মানুষের ভোটাধিকার ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। একই সঙ্গে তিনি তাঁর আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন।
বিএনপির কর্মসূচি
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে বিএনপি কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ সারা দেশে দলীয় কার্যালয়গুলোতে দলীয় পতাকা উত্তোলন করা হবে। পাশাপাশি বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনগুলোর উদ্যোগে জেলা, মহানগর, উপজেলা ও থানা পর্যায়ে আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হবে।
আজ সোমবার সকাল ১১টায় শেরেবাংলানগরে শহীদ জিয়াউর রহমানের কবরে বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্যসহ সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা পুষ্পস্তবক অর্পণ ও ফাতেহা পাঠ করবেন। আগামীকাল মঙ্গলবার সকাল ১১টায় কাকরাইলের ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশের মাল্টিপারপাস মিলনায়তনে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে।
দৈনিক অধিকার ডেস্ক 



















